আমের খানকে কেউ চায় না, আবার সবাই চায়

ব্রাদার্স ইউনিয়ন থেকে জাতীয় দল, টিম ম্যানেজার থেকে মিডিয়া ম্যানেজার আমের খানকে ঘিরে বাফুফের পদ-পদবি পুনর্বণ্টনের রাজনীতি, যোগ্যতার প্রশ্ন ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অনুসন্ধান।
বাংলাদেশের ফুটবলে জাতীয় দলের ম্যানেজারের পদটি কি দায়িত্ব পালনের জায়গা, নাকি ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে পদ-পদবি বণ্টনের একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা? প্রশ্নটি নতুন নয়। তবে আমের খানের সাম্প্রতিক দায়িত্ব পরিবর্তন এই প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। প্রায় দুই বছর জাতীয় দলের টিম ম্যানেজার থাকার পর তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু পুরোপুরি বাদ দেওয়া হলো না। দেওয়া হলো টিম কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব। এরপর ফিফা আসিয়ান কাপে তাঁর দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়ে করা হলো হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। এবার ২০২৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে টিম কো-অর্ডিনেটরের পাশাপাশি তাঁকে দেওয়া হয়েছে টিম মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব। সঙ্গে রয়েছে দলের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বও।
একজন কর্মকর্তার পদ পরিবর্তনের এই ধারাবাহিকতা স্বাভাবিক প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি পরিবর্তনের পর যখন নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়, তখন সেটিকে নিছক দায়িত্বের রদবদল বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
বিশেষ করে যখন বাফুফের নিজস্ব মিডিয়া বিভাগে একজন পূর্ণকালীন মিডিয়া ম্যানেজার রয়েছেন, যিনি জাতীয় দলের মিডিয়া ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর জায়গায় এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, যিনি নিজেই সংবাদমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন, মিডিয়া ম্যানেজার হিসেবে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।
তাহলে প্রশ্ন উঠবেই আমের খানকে কি তাঁর যোগ্যতার কারণে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, নাকি তাঁকে জাতীয় দলের সঙ্গে রাখার জন্যই একের পর এক নতুন দায়িত্ব তৈরি হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমের খানের ফুটবলজীবন, ব্রাদার্স ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক, জাতীয় দলের প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং বাফুফের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
১. আমের খানের ক্যারিয়ার: খেলোয়াড় থেকে সংগঠক
মোহাম্মদ আমের খান। বাংলাদেশের ফুটবলে পরিচিত মুখ। ১৯৭১ সালের ৯ নভেম্বর জন্ম নেওয়া সাবেক এই মিডফিল্ডারের ফুটবলজীবনের শুরু ব্রাদার্স ইউনিয়নে। ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে ক্লাবটির হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবলে যাত্রা। ১৯৯৩ সালে তিনি যোগ দেন ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবে। ওই বছর দলটির প্রথম বিভাগে উন্নীত হওয়ার সাফল্যের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৪ সালে আবার ফিরে আসেন ব্রাদার্স ইউনিয়নে। পরবর্তী সময়ে ক্লাবটির অধিনায়কত্বও করেন।
১৯৯৮ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপ বাছাইপর্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০০১ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার পর ২০০২ সাল থেকে ব্রাদার্স ইউনিয়নের নির্বাহী পরিচালক ও টিম ম্যানেজারের দায়িত্বে যুক্ত হন।
এখানেই তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরু। খেলোয়াড় হিসেবে যে ক্লাবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, অবসর নেওয়ার পর সেই ক্লাবের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হন। ২০০৩-০৪ মৌসুমে ব্রাদার্স ইউনিয়নের ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন লিগ শিরোপা জয়ের সময়ও তিনি ক্লাব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২০ সালের নির্বাচনের পর তাঁর প্রশাসনিক অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ক্যারিয়ারের সময়রেখা বলছে, আমের খানের শক্তিশালী পরিচয় মূলত ব্রাদার্স ইউনিয়নকেন্দ্রিক। দীর্ঘদিনের ক্লাব ব্যবস্থাপনা, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং ফুটবল প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাঁর পেশাগত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন দীর্ঘদিন ক্লাব পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় দলের মিডিয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালনার যোগ্যতা এক বিষয় নয়।
২. ব্রাদার্স ইউনিয়ন: দুই দশকের বেশি সময়ের সম্পর্ক, স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন
আমের খানের নাম উচ্চারিত হলে ব্রাদার্স ইউনিয়নের প্রসঙ্গ আসবেই। ২০০২ সাল থেকে ক্লাবটির ব্যবস্থাপনায় তাঁর সম্পৃক্ততা। অর্থাৎ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি ক্লাবের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনিক সম্পর্ক রয়েছে।
এখানে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের ফুটবলে একটি ক্লাবকে এত দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠিত রাখা সহজ কাজ নয়। কিন্তু প্রশ্নটি অভিজ্ঞতা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি দায়িত্বের নিরপেক্ষতা নিয়ে।
ব্রাদার্স ইউনিয়ন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের একটি প্রতিযোগী ক্লাব। অন্যদিকে জাতীয় দল পরিচালিত হয় বাফুফের অধীনে। জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে একজন কর্মকর্তাকে খেলোয়াড়দের ক্যাম্প, ক্লাব থেকে খেলোয়াড় ছাড়িয়ে আনা, ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ, খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধা এবং জাতীয় দলের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব ক্লাবের স্বার্থ থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা কতটা সম্ভব?
ধরা যাক, জাতীয় দলের ক্যাম্পে ব্রাদার্স ইউনিয়নের কোনো খেলোয়াড়কে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলো। অথবা ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে জাতীয় দলের ক্যাম্পে খেলোয়াড়ের উপস্থিতি নিয়ে সমন্বয় প্রয়োজন হলো। তখন জাতীয় দলের দায়িত্ব এবং ক্লাবের দায়িত্বের মধ্যে অগ্রাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হবে?
এটি আমের খানের বিরুদ্ধে কোনো পক্ষপাতের অভিযোগ নয়। বরং একটি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
বাফুফের উচিত ছিল এমন দ্বৈত দায়িত্বের ক্ষেত্রে লিখিত স্বার্থের সংঘাত নীতি প্রকাশ করা। জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজ ক্লাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে তাঁকে আলাদা রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না, সেটিও জানা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে এমন নজির আছে?
আন্তর্জাতিক ফুটবলে একই ব্যক্তির ক্লাব ও জাতীয় দলের দায়িত্ব পালনের উদাহরণ রয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে: অধিকাংশ পরিচিত উদাহরণ প্রধান কোচের, প্রশাসনিক টিম ম্যানেজারের নয়।
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন: ১৯৮৫ সালে অ্যাবারডিনের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় স্কটল্যান্ড জাতীয় দলের অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব নেন। জক স্টেইনের মৃত্যুর পর তিনি জাতীয় দলের দায়িত্ব সামলান এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে জায়গা করে দিতে সাহায্য করেন।
রিনুস মিশেলস: ১৯৭৪ সালে বার্সেলোনার কোচ থাকার সময় নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। একই সময়ে ক্লাব ও জাতীয় দলের দায়িত্ব সামলানোর বিরল উদাহরণ এটি।
ফার্নান্দো দিনিজ: ২০২৩ সালে ফ্লুমিনেন্সের কোচ থাকার পাশাপাশি ব্রাজিল জাতীয় দলের প্রধান কোচ হন। একদিকে ক্লাব, অন্যদিকে জাতীয় দল দুই দায়িত্বের বাস্তব উদাহরণ।
ফ্রানচেস্কো কালজোনা: ২০২৪ সালে নাপোলির কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি স্লোভাকিয়া জাতীয় দলের কোচের দায়িত্বও পালন করেন।
আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে ২০২৬ সালে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের কোচ মাইকেল ও’নিল ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের দায়িত্বও পালন করেছেন। এ নিয়ে ইংলিশ ফুটবল লিগের কয়েকটি ক্লাব স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তুলেছিল। কারণ ব্ল্যাকবার্নের সঙ্গে একই লিগে টিকে থাকার লড়াইয়ে থাকা ক্লাবগুলোর খেলোয়াড়ও তাঁর জাতীয় দলে ছিলেন।
এই ঘটনাগুলো দেখায়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে দ্বৈত দায়িত্ব একেবারে নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু সেটি প্রশ্নের ঊর্ধ্বেও নয়। স্বচ্ছতা, দায়িত্বের সীমা এবং স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এসব উদাহরণকে আমের খানের ক্ষেত্রে সরাসরি সমতুল্য বলা যাবে না। কোচের দ্বৈত দায়িত্ব এবং ক্লাব কর্মকর্তা হিসেবে জাতীয় দলের প্রশাসনিক দায়িত্ব এক জিনিস নয়। আমের খানের ক্ষেত্রে বাফুফের কাছে তাই আরও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত।
৩. ২০১২ সালের বিতর্ক: আমের খানের ক্যারিয়ারে একটি অস্বস্তিকর অধ্যায়
আমের খানকে ঘিরে পুরোনো বিতর্কের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ২০১২ সালের ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ।
৭ আগস্ট ২০১২, দ্য ডেইলি স্টার প্রকাশ করে ‘Amer lets cat out of the bag’ শিরোনামের প্রতিবেদন। সেখানে বলা হয়, ব্রাদার্স ইউনিয়নের ম্যানেজার হিসেবে আমের খান টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন, ২৬ মে ২০১২ তারিখে আবাহনীর বিপক্ষে একটি ম্যাচে তাঁদের ইচ্ছাকৃতভাবে হারতে বাধ্য করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ম্যাচটি ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এটি ছিল অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ। একজন ক্লাব ম্যানেজার যখন প্রকাশ্যে ম্যাচ পাতানোর কথা বলেন, তখন বিষয়টি শুধু একটি ম্যাচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; দেশের ফুটবলের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
কিন্তু ঘটনার পরপরই আমের খানের অবস্থানে পরিবর্তন আসে।
৯ আগস্ট দ্য ডেইলি স্টার প্রকাশ করে ‘Amer terms interview fabricated’ শিরোনামের আরেকটি প্রতিবেদন। সেখানে আমের খান দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য টেলিভিশনে প্রেক্ষাপটের বাইরে প্রচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, সাক্ষাৎকারের বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে এবং তিনি নির্দিষ্ট ম্যাচ পাতানোর কথা বলেননি।
বাফুফের তৎকালীন পেশাদার লিগ কমিটি তাঁকে তলব করে। সাক্ষাৎকারের ভিডিও দেখানো হয় এবং তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সম্প্রচারিত বক্তব্যের অসংগতি নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ ভিডিও সংগ্রহ করে বিষয়টি পর্যালোচনার কথাও বলা হয়েছিল।
এখানে সতর্কতা জরুরি: এই ঘটনা থেকে আমের খান ম্যাচ পাতানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো ভিত্তি নেই। বরং তিনি নিজেই অভিযোগ করেছিলেন এবং পরে সেই বক্তব্যের উপস্থাপন নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন।
তবে একজন ফুটবল প্রশাসকের পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা আলোচনায় আসা স্বাভাবিক। বিশেষ করে যিনি পরবর্তী সময়ে জাতীয় দলের মতো সংবেদনশীল দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁর অতীতের বিতর্কগুলোও জনপরিসরে পর্যালোচিত হবে।
৪. ২০২০: জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে যাত্রা
২০২০ সালের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের ম্যানেজার হিসেবে আমের খানের নাম ঘোষণা করা হয়। পরদিন ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, তিনি আগের ম্যানেজার সত্যজিৎ দাশ রুপুকে সরিয়ে দায়িত্ব পেয়েছেন।
সে সময় তিনি ব্রাদার্স ইউনিয়নের পরিচালক ও দীর্ঘদিনের ম্যানেজার। একই সঙ্গে বাফুফের নির্বাচিত নির্বাহী কমিটির সদস্য।
জাতীয় দলের দায়িত্বে আসার পেছনে তাঁর সাবেক ফুটবলার পরিচয় এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই বিবেচনায় ছিল। এর আগে বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের ব্যবস্থাপনায়ও তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
তবে এই নিয়োগের সঙ্গে একটি বড় প্রশ্নও ছিল। বাফুফে কি জাতীয় দলের জন্য একজন পেশাদার, পূর্ণকালীন টিম ম্যানেজার নিয়োগ দিতে চেয়েছিল, নাকি নির্বাহী কমিটির সঙ্গে যুক্ত একজন সংগঠককেই সেই দায়িত্ব দিয়েছিল?
২০২৩ সালের মে মাসে যুগান্তর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমের খানকে জাতীয় দলের ম্যানেজার করার আগে বাফুফে পেশাদার ম্যানেজার নিয়োগের কথা বলেছিল। কিন্তু আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই নিয়োগ বাস্তবায়িত হয়নি। বরং দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সাবেক ফুটবলার ও ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের।
এখানে বাফুফের নীতিগত ধারাবাহিকতার প্রশ্ন ওঠে। পেশাদার ম্যানেজার নিয়োগের পরিকল্পনা থাকলে সেটি বাস্তবায়িত হলো না কেন? আর যদি নির্বাচিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের লিখিত নীতিমালা কোথায়?
৫. ২০২৩: ইকবাল হোসেনের পরিবর্তে আমের খান
২০২৩ সালের ১৩ মে জাতীয় দল কমিটির সভার পর আমের খানকে আবারও জাতীয় দলের ম্যানেজার করা হয়। এর আগে দায়িত্বে ছিলেন ইকবাল হোসেন।
২১ জুন ভারতের বেঙ্গালুরুতে শুরু হওয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতির আগে এই পরিবর্তন আসে। যুগান্তর-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাফুফের সহসভাপতি ও জাতীয় দল কমিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী নাবিল আহমেদ জানিয়েছিলেন, নির্বাহী কমিটির মধ্য থেকে ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আমের খান তখন বলেছিলেন, দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে তিনি সচেষ্ট থাকবেন।
কিন্তু জাতীয় দলের ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একটি বিষয় সামনে আসে বাংলাদেশ ফুটবলে ম্যানেজার নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের চেয়ে প্রশাসনিক অবস্থান কি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?
একজন ম্যানেজারের কাজ কেবল দলের সঙ্গে সফর করা নয়। খেলোয়াড়দের আবাসন, যাতায়াত, খাবার, অনুশীলনের পরিবেশ, আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রশাসনিক সমন্বয়, খেলোয়াড়দের ক্লাব থেকে ছাড়িয়ে আনা, ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা সবকিছুর সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব জড়িত।
এমন একটি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং মূল্যায়নের নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা উচিত।
৬. ম্যানেজার থাকাকালে সমালোচনা: ব্যবস্থাপনায় প্রশ্ন উঠেছিল কোথায়?
আমের খান জাতীয় দলের ম্যানেজার থাকার সময়ে প্রতিটি প্রশাসনিক সমস্যার দায় তাঁর ওপর চাপানো ন্যায্য হবে না। তবে তাঁর দায়িত্বকালীন কিছু ঘটনা ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছিল।
২০২৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে কম্বোডিয়া থেকে বেঙ্গালুরু যাওয়ার পথে বাংলাদেশ দলের সফরে জটিলতা দেখা দেয়। ১৮ জুন দ্য ডেইলি স্টার জানায়, দলের ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছিল, ভারতের বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় সময় লেগেছিল এবং প্রথমে যে হোটেলে দল উঠেছিল, সেটি নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়।
আমের খান নিজেই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, হোটেলের কক্ষ খেলোয়াড়দের জন্য যথেষ্ট উপযোগী ছিল না এবং সকালের খাবারও সন্তোষজনক ছিল না। পরে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সহযোগিতায় দলকে অন্য হোটেলে স্থানান্তর করা হয়।
এই ঘটনা সরাসরি তাঁর ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। ফ্লাইট বিলম্ব বা ইমিগ্রেশনের মতো বিষয় ম্যানেজারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারে। বরং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য ও হোটেল পরিবর্তনের উদ্যোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে জাতীয় দলের ব্যবস্থাপনা কতটা আগাম পরিকল্পিত ছিল, সে প্রশ্ন থেকে যায়। আন্তর্জাতিক সফরের আগে হোটেল, খাবার, যাতায়াত ও ভিসা-সংক্রান্ত প্রস্তুতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার ছিল? ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দায়িত্ব পালনের সময় এসব সমস্যার পর বাফুফে কোনো আনুষ্ঠানিক পারফরম্যান্স মূল্যায়ন প্রকাশ করেছিল কি না।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: কোনো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে সমালোচনা প্রকাশিত হওয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যর্থতা প্রমাণিত হওয়া এক কথা নয়। আমের খানের দায়িত্বকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে ব্যবস্থাপনার কিছু দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা যায়; কিন্তু সেগুলোর প্রতিটির দায় তাঁর ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারণ করতে হলে বাফুফের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টও প্রয়োজন।
৭. ২০২৬: ম্যানেজার পদ থেকে অব্যাহতি, কিন্তু আমের খানকে ছাড়তে পারছে না বাফুফে?
২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট বাফুফে জাতীয় দলের ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনে। ফিফা আসিয়ান কাপ সামনে রেখে আমের খানের পরিবর্তে টিম ম্যানেজারের প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আমিরুল ইসলাম বাবুকে। ইকবাল হোসেনকে করা হয় টিম লিডার। আমের খানকে রাখা হয় টিম কো-অর্ডিনেটর হিসেবে।
বাফুফের এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি প্রশাসনিক যুক্তির কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। আমের খান নির্বাচিত নির্বাহী কমিটির সদস্য না হওয়ায় ফেডারেশনের ভেতরে তাঁর টিম ম্যানেজার পদ নিয়ে অসন্তোষ ছিল। একাধিক নির্বাচিত সদস্যের দাবি ছিল, জাতীয় দলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদটি নির্বাহী কমিটির মধ্য থেকেই কাউকে দেওয়া উচিত।
এখানে প্রশ্নটি আরও জটিল। যদি আমের খান দায়িত্ব পালনে অযোগ্য হতেন, তাহলে তাঁকে সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট ছিল। আর যদি তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাফুফের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে তাঁকে ম্যানেজারের পদ থেকে সরিয়ে অন্য একটি দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজন কেন হলো?
আরও অস্বস্তিকর বিষয় হলো, তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানোর প্রক্রিয়া।
৩০ ও ৩১ আগস্টের বিভিন্ন সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, আমের খান নিজেই জানিয়েছিলেন, মিডিয়া ম্যানেজারের মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন যে তিনি আর টিম ম্যানেজার নেই। অর্থাৎ যাঁর সঙ্গে প্রায় দুই বছর কাজ করেছেন, সেই জাতীয় দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি তাঁকে সরাসরি জানানো হয়নি।
তাঁর বক্তব্য ছিল, কো-অর্ডিনেটরের কাজটি কী, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। এটি পদোন্নতি, নাকি পদাবনতি—সেটিও তাঁর কাছে পরিষ্কার ছিল না।
একজন কর্মকর্তার দায়িত্ব পরিবর্তন হতেই পারে। কিন্তু যেভাবে পরিবর্তনটি ঘটেছে, তা প্রশাসনিক সৌজন্য ও পেশাদারিত্বের প্রশ্ন তৈরি করে।
আমের খানের অসন্তোষের বিষয়টি এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রকাশ্যে দায়িত্ব পরিবর্তন নিয়ে নিজের অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ নতুন পদ পেয়ে তিনি যে সন্তুষ্ট ছিলেন, এমন কোনো চিত্র সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন হলো, যে কর্মকর্তা নিজেই নতুন দায়িত্বের প্রকৃতি বুঝতে পারছেন না, তাঁর জন্য সেই পদ তৈরি বা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল?
৮. কো-অর্ডিনেটর থেকে হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন: পদবির পরিবর্তন, নাকি দায়িত্বের পুনর্বাসন?
ফিফা আসিয়ান কাপ ২০২৬-এ আমের খানের দায়িত্ব কেবল টিম কো-অর্ডিনেটরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইন্দোনেশিয়ায় দলের সঙ্গে যাওয়ার পর তাঁর দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়ে হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে আবারও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে।
- কো-অর্ডিনেটর হিসেবে তাঁর দায়িত্বের লিখিত বিবরণ কী ছিল?
- বিদেশে যাওয়ার পর কেন তাঁকে হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন করা হলো?
- এই পরিবর্তন কি পূর্বপরিকল্পিত ছিল, নাকি পরিস্থিতির প্রয়োজনে?
- দলের মূল ম্যানেজার ও কো-অর্ডিনেটরের মধ্যে দায়িত্বের বিভাজন কীভাবে নির্ধারিত হয়েছিল?
- টিম লিডার, ম্যানেজার ও কো-অর্ডিনেটরের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার হাতে ছিল?
এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি জাতীয় দলের প্রশাসনিক কাঠামো যত বেশি অস্পষ্ট হবে, তত বেশি সমন্বয়হীনতার আশঙ্কা তৈরি হবে।
২৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ঢাকা পোস্ট ও মানবজমিনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে আসিয়ান কাপের পর দলের শৃঙ্খলা ও ঐক্য নিয়েও প্রশ্ন উঠে আসে। একাধিক খেলোয়াড়ের রাতে হোটেল থেকে বের হওয়া এবং নাইট ক্লাবে যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আমের খানের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দেওয়া রিপোর্টেও দলের শৃঙ্খলা ও ঐক্যের অভাবের বিষয়টি উঠে এসেছিল।
এখানে আবারও প্রশ্ন: দলের প্রশাসনিক সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার রিপোর্টে যদি শৃঙ্খলার ঘাটতি উঠে আসে, তাহলে সেই ঘাটতি দূর করতে তাঁর পরবর্তী দায়িত্ব কীভাবে নির্ধারিত হলো?
কোনো ব্যক্তিকে ব্যর্থ প্রমাণের জন্য এই প্রশ্ন নয়। বরং তাঁর দায়িত্বের ফলাফল এবং পরবর্তী পদায়নের মধ্যে যৌক্তিক সম্পর্ক আছে কি না, সেটি বোঝার জন্য।
৯. সাদমান সাকিবের জায়গায় আমের খান: মিডিয়া ম্যানেজার নিয়োগের রহস্য
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ সম্ভবত এটিই।
বাফুফের নিজস্ব মিডিয়া বিভাগ রয়েছে। সেখানে মিডিয়া ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাদমান সাকিব। তাঁর সঙ্গে ডেপুটি মিডিয়া ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ নওমীও রয়েছেন।
অর্থাৎ জাতীয় দলের মিডিয়া ব্যবস্থাপনা করার জন্য বাফুফের নিজস্ব জনবল ও কাঠামো আগে থেকেই ছিল।
তারপরও ২০২৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে আমের খানকে টিম মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়া হলো কেন?
২৬ অক্টোবর ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাফুফের নিজস্ব মিডিয়া বিভাগে সাদমান সাকিব দায়িত্বে থাকলেও সিনিয়র পুরুষ জাতীয় দলের মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমের খানকে। অন্যদিকে মানবজমিনের একই দিনের প্রতিবেদনে আমের খানের নিজের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে মিডিয়া ম্যানেজার হিসেবে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।
এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
একজন মিডিয়া ম্যানেজারের কাজ শুধু সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে পরিচিত থাকা নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই পদটি অত্যন্ত পেশাদার একটি দায়িত্ব।
এর মধ্যে রয়েছে:
১. সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তথ্য সরবরাহ।
২. সংবাদ সম্মেলন ও সাক্ষাৎকারের সময়সূচি নির্ধারণ।
৩. খেলোয়াড় ও কোচের মিডিয়া অ্যাপিয়ারেন্স সমন্বয়।
৪. সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন ও প্রবেশাধিকার ব্যবস্থাপনা।
৫. টুর্নামেন্ট আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট মিডিয়া কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ।
৬. জাতীয় দলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তথ্য প্রকাশের সমন্বয়।
৭. ভুল তথ্য, বিতর্ক বা সংকটের সময় দায়িত্বশীল যোগাযোগ নিশ্চিত করা।
এসব দায়িত্ব পালনের জন্য অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত কাজের অভ্যাস প্রয়োজন।
আমের খান নিজেই যখন বলছেন, মিডিয়া ম্যানেজার হিসেবে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তখন তাঁকে এই পদে নিয়োগের যৌক্তিকতা বাফুফেকেই ব্যাখ্যা করতে হবে।
তাহলে সাদমান সাকিবের অপরাধ কী?
এখানে সাদমান সাকিবের কাজের মূল্যায়নও জরুরি। তিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় জাতীয় দলের মিডিয়া কার্যক্রমে কী ধরনের ঘাটতি ছিল? বাফুফে কি তাঁর পারফরম্যান্সে অসন্তুষ্ট ছিল? তাঁকে সরানোর আগে কোনো মূল্যায়ন করা হয়েছিল? নাকি জাতীয় দলের টুর্নামেন্টভিত্তিক মিডিয়া দায়িত্ব ও ফেডারেশনের নিয়মিত মিডিয়া বিভাগের দায়িত্ব আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?
এসব প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট উত্তর প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাদমানের পরিবর্তে আমের খানকে নিয়োগ দেওয়ার ফলে জাতীয় দলের মিডিয়া কার্যক্রমে কী নতুনত্ব আসবে, সেটিও অজানা।
একজন অভিজ্ঞ মিডিয়া ম্যানেজারকে সরিয়ে এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়ার অর্থ কী, যিনি নিজেই এই কাজের অভিজ্ঞতা না থাকার কথা জানিয়েছেন?
সাদমানের কাজের কোনো ঘাটতি থাকলে সেটি প্রকাশ করা উচিত। আর তাঁর কাজ সন্তোষজনক হলে তাঁকে সরানোর কারণও ব্যাখ্যা করা উচিত।
কারণ জাতীয় দল কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের জায়গা নয়। এখানে প্রতিটি পদে নিয়োগের ভিত্তি হওয়া উচিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন।
১০. আমের খানকে কেউ চায় না, আবার সবাই চায় শিরোনামের ভেতরের রাজনীতি
এই শিরোনামের প্রথম অংশের পক্ষে যুক্তি কোথায়?
আমের খান যখন টিম ম্যানেজার ছিলেন, তখন তাঁর পদ নিয়ে ফেডারেশনের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। নির্বাচিত নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকে ম্যানেজার নিয়োগের দাবি ওঠে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সরিয়ে আমিরুল ইসলাম বাবুকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তাঁকে সরানোর প্রক্রিয়াও ছিল অস্বস্তিকর। তিনি নিজেই বলেছেন, মিডিয়া ম্যানেজারের কাছ থেকে দায়িত্ব পরিবর্তনের খবর পেয়েছেন। নতুন কো-অর্ডিনেটর পদটি তাঁর কাছে পরিষ্কার ছিল না। পদোন্নতি নাকি পদাবনতি সেটিও বুঝতে পারছিলেন না।
এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরও তাঁকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। বরং নতুন পদ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেই পদও বিস্তৃত হয়েছে। এবার আবার মিডিয়া ও নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হলো।
অর্থাৎ ম্যানেজার হিসেবে তাঁকে আর চাওয়া হয়নি, কিন্তু জাতীয় দলের ব্যবস্থাপনা থেকে তাঁকে সরিয়েও রাখা হয়নি।
এটাই শিরোনামের দ্বিতীয় অংশের যুক্তি।
তবে এখানে একটি সতর্কতা প্রয়োজন। তাঁকে কেউ চায় না এটি আক্ষরিক অর্থে সবার অবস্থান নয়। বরং তাঁর টিম ম্যানেজার পদ নিয়ে আপত্তি ছিল, দায়িত্ব পরিবর্তন নিয়ে তাঁর নিজের অসন্তোষ ছিল এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে ঘিরে পদ-পদবি পুনর্বণ্টনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে তাঁকে সবাই চায় এটিও আক্ষরিক অর্থে সবার মত নয়। বাফুফের সিদ্ধান্তে বারবার তাঁকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটিই এই বক্তব্যের প্রশাসনিক ভিত্তি।
একজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে আবার অন্য গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর এই ধারাবাহিকতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে তাঁকে কি তাঁর কাজের জন্য প্রয়োজন, নাকি তাঁকে জাতীয় দলের কাঠামোর মধ্যে রাখাটাই কোনোভাবে প্রয়োজন হয়ে উঠেছে?
১১. বাফুফে কেন আমের খানকে ধরে রাখতে চাইছে? সম্ভাব্য চারটি ব্যাখ্যা
এখানে উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। তবে বাফুফের ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত থেকে কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তৈরি হয়।
প্রথমত, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা। ব্রাদার্স ইউনিয়নে দুই দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় দলের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে আমের খানকে ফেডারেশন কার্যকর সংগঠক হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সমন্বয়। জাতীয় দল কমিটির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফেডারেশনের ভেতরে কাজের অভিজ্ঞতা ও পরিচিতির কারণে তাঁকে বিভিন্ন দায়িত্বে রাখা সহজ হতে পারে।
তৃতীয়ত, দায়িত্বের ধারাবাহিকতা। দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। নতুন ম্যানেজার দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাঁকে রেখে দিলে কিছু কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব।
চতুর্থত, প্রশাসনিক সমঝোতা। ম্যানেজারের পদ থেকে সরানোর পরও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখার মাধ্যমে ফেডারেশনের ভেতরের কোনো অসন্তোষ বা মতপার্থক্য সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, প্রমাণিত তথ্য নয়।
কিন্তু এসব ব্যাখ্যার কোনটি বাস্তব কারণ, তা বাফুফে প্রকাশ না করলে সন্দেহ দূর হবে না।
১২. আসল সমস্যা আমের খান, নাকি বাফুফের নিয়োগনীতি?
আমের খানের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তাঁর দায়িত্ব পালন নিয়েও সমালোচনা করা যায়। কিন্তু সমস্যাটিকে কেবল একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে মূল প্রশাসনিক সংকট আড়াল হয়ে যাবে।
প্রশ্ন হওয়া উচিত, বাফুফে জাতীয় দলের প্রতিটি পদে নিয়োগের জন্য কী মানদণ্ড অনুসরণ করে?
একজন টিম ম্যানেজারের কাজ কী? টিম কো-অর্ডিনেটরের কাজ কী? হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সঙ্গে ম্যানেজারের পার্থক্য কী? মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব কী? এসব পদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা কি লিখিতভাবে নির্ধারিত?
যদি নির্ধারিত থাকে, তাহলে সেগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন?
একই ব্যক্তিকে টুর্নামেন্টভেদে একাধিক দায়িত্ব দেওয়া হলে তার মূল্যায়ন কীভাবে হবে? একজন কর্মকর্তা একই সঙ্গে একাধিক দায়িত্ব পালন করলে তাঁর জবাবদিহির কাঠামো কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া জাতীয় দলের প্রশাসনিক কাঠামোকে পেশাদার বলা কঠিন।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দলের ব্যবস্থাপনা কোনো সম্মানসূচক পদ-পদবি দেওয়ার জায়গা হওয়া উচিত নয়। এখানে প্রত্যেক কর্মকর্তা দলের পারফরম্যান্সের বাইরে থাকা প্রশাসনিক দায়িত্বগুলো দক্ষতার সঙ্গে পালন করবেন—এটাই প্রত্যাশিত।
সুতরাং আমের খানকে মিডিয়া ম্যানেজার করার সিদ্ধান্তটি তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতার মূল্যায়নের পাশাপাশি বাফুফের নিজস্ব মিডিয়া বিভাগের কার্যকারিতারও একটি পরীক্ষা।
যদি সাদমান সাকিবের কাজ ভালো হয়ে থাকে, তাঁকে সরানোর ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আর যদি আমের খানকে নতুন দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে বিশেষ কোনো দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা থাকে, সেটিও প্রকাশ করা উচিত।
নইলে প্রশ্ন থেকেই যাবে পদটি কি কাজের প্রয়োজনে, নাকি ব্যক্তির প্রয়োজনে?
১৩. বাফুফের কাছে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া জরুরি
একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের স্বার্থে বাফুফের কাছে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর চাওয়া প্রয়োজন।
১. আমের খানকে টিম ম্যানেজারের পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্তের লিখিত কারণ কী?
২. তাঁকে টিম কো-অর্ডিনেটর করার সময় দায়িত্বের লিখিত বিবরণ দেওয়া হয়েছিল কি?
৩. ফিফা আসিয়ান কাপে তাঁকে হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন করার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন?
৪. সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত জাতীয় দল কমিটি, বাফুফে সভাপতি নাকি অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ নিয়েছে?
৫. সাদমান সাকিবকে কেন এই দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে? তাঁর কাজের কোনো আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন হয়েছিল কি?
৬. আমের খানের মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে নিয়োগের যোগ্যতার ভিত্তি কী?
৭. আমের খান কি একই সঙ্গে টিম কো-অর্ডিনেটর, মিডিয়া ম্যানেজার ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবেন? এসব দায়িত্বের মধ্যে অগ্রাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হবে?
৮. ব্রাদার্স ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা জাতীয় দলের দায়িত্ব পালনে স্বার্থের সংঘাত তৈরি করছে কি না, তা যাচাই করার কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কি?
৯. টিম ম্যানেজার, কো-অর্ডিনেটর, টিম লিডার ও মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব ও জবাবদিহি কি লিখিতভাবে নির্ধারিত?
১০. এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাফুফের কোনো প্রকাশিত যোগ্যতার মানদণ্ড রয়েছে কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেলে বিতর্কের অনেকটাই অবসান হতে পারে।
জাতীয় দল কারও ব্যক্তিগত প্রশাসনিক পরিসর নয়
বাংলাদেশের ফুটবল এমনিতেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মাঠের পারফরম্যান্স, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য, অবকাঠামো, পেশাদার লিগ সব জায়গাতেই উন্নতির প্রয়োজন। এমন সময়ে জাতীয় দলের প্রশাসনিক কাঠামো যদি পদ-পদবি পুনর্বণ্টনের বিতর্কে আটকে যায়, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
আমের খান একজন সাবেক ফুটবলার। ব্রাদার্স ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবেও তিনি দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু অভিজ্ঞতা থাকলেই সব দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তৈরি হয় না। বিশেষ করে মিডিয়া ব্যবস্থাপনার মতো পেশাদার কাজে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
তাঁকে ম্যানেজারের পদ থেকে সরানো হলো, কিন্তু বাদ দেওয়া হলো না। কো-অর্ডিনেটর করা হলো, পরে হেড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, এবার মিডিয়া ম্যানেজার। প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তাই প্রশ্নটি আমের খানকে নিয়ে যতটা, তার চেয়ে বেশি বাফুফেকে নিয়ে।
জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে তাঁকে কেন আর প্রয়োজন হলো না? আবার মিডিয়া ম্যানেজার হিসেবে কেন প্রয়োজন হলো? সাদমান সাকিবের জায়গায় আমের খান কী নতুনত্ব আনবেন? আর যদি তাঁকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজনই না থাকে, তাহলে ম্যানেজারের পদ থেকে সরানোর যুক্তি কী ছিল?
একজন কর্মকর্তাকে ধরে রাখার জন্য পদ বদলানো হচ্ছে, নাকি জাতীয় দলের প্রয়োজনেই দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হচ্ছে এই পার্থক্যটা বাফুফেকে স্পষ্ট করতে হবে।
কারণ জাতীয় দল কোনো ব্যক্তির কর্মস্থল ধরে রাখার প্রকল্প নয়। এটি দেশের ফুটবলের প্রতিনিধিত্ব করে। এখানে পদ-পদবি নয়, যোগ্যতা ও কাজের মূল্যায়নই হওয়া উচিত শেষ কথা।
আমের খানকে কেউ চায় না, আবার সবাই চায় এই শিরোনামের বিতর্কের প্রকৃত উত্তর তাই আমের খানের কাছে নয়; উত্তর দিতে হবে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকেই।
গবেষণায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশিত সূত্র
1. The Daily Star — Chasing an elusive title (২০০৩)। ব্রাদার্স ইউনিয়নে আমের খানের ব্যবস্থাপনার শুরুর সময়কার প্রতিবেদন।
2. The Daily Star — Amer lets cat out of the bag (২০১২) এবং Amer terms interview fabricated। ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ ও পরবর্তী ব্যাখ্যা।
3. Dhaka Tribune — Amer named team manager for Nepal, Qatar games (২০২০)। জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ।
4. যুগান্তর — জাতীয় ফুটবল দলের নতুন ম্যানেজার আমের খান (২০২৩)। ইকবাল হোসেনের পরিবর্তে দায়িত্ব গ্রহণ।
5. The Daily Star — Booters settle in Bengaluru after immigration, hotel hassles। ২০২৩ সাফের আগে দলের সফর ও হোটেল ব্যবস্থাপনার সমস্যা।
6. Observer — BFF reshuffle raises questions as Amer Khan loses manager’s role। ২০২৬ সালে ম্যানেজার পদ থেকে সরানো এবং আমের খানের অসন্তোষ।
7. Kaleralo — জাতীয় ফুটবল দলের ম্যানেজার বদল। বাফুফের নতুন দায়িত্ব বণ্টন।
8. Dhaka Post — সাফেও পদ-পদবি ভাগাভাগি, কর্মকর্তা মিডিয়া ম্যানেজার। সাদমান সাকিবের পরিবর্তে আমের খানকে মিডিয়া ম্যানেজার করার বিতর্ক।
9. মানবজমিন — বারবার আমের খানের দায়িত্ব পাল্টাচ্ছে বাফুফে। আমের খানের নিজের বক্তব্য, নতুন দায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা ও পারিশ্রমিকের প্রশ্ন।
10. The Managers Taking Double Roles in Club and National Team। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দ্বৈত কোচিং দায়িত্বের উদাহরণ।
11. BBC Sport — Concerns raised about Blackburn boss O’Neill’s dual role। ২০২৬ সালে ক্লাব ও জাতীয় দলের দ্বৈত দায়িত্ব নিয়ে স্বার্থের সংঘাতের বিতর্ক।