জেরার্ড জোন্স-এ বদলে যাবে বাংলাদেশ?

এ বছরের জুন মাসে বাফুফে ‘ইয়ুথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ বিভাগের প্রধান হিসেবে ২ বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয় জেরার্ড জোন্স’কে।

ইয়র্কে জন্ম নেয়া এই ইংলিশ কোচ, কিংবা কোচদেরও কোচ’কে নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১১৫ টা সিভি থেকে বাছাই করে। প্রথমিকভাবে তাকে বাফুফের যুব দলগুলো যেমন অনুর্ধ-১৪ থেকে অনুর্ধ-২৩ পর্যন্ত দলগুলোর উন্নয়নে কাজ করা; পাশাপাশি আসন্ন ২০২৭ এএফসি এশিয়ান কাপের জন্য অনুর্ধ-২০ দলকে প্রস্তুত করা। জেরার্ড আপাতত এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

জেরার্ড তখনো ফুটবলটা ভালো করে রপ্ত করছেন; হেলিফ্যাক্স টাউনের যুব দলের হয়ে খেলেন। তবে তিনি যে ভবিষ্যতে এই খেলা দিয়ে বেশি আগাতে পারবেন না, এটা মোটামুটি মেপে নিয়েছিলেন। তবে কোচিংটা যে তাকে দিয়ে হবে, সেটাও তিনি ধরতে পেরেছিলেন কিশোর বয়সেই! তাই ক্লাবের এক্সিলেন্স প্রোগ্রামের মাধ্যমে হেলিফ্যাক্সের অনুর্ধ-১২ ও অনুর্ধ-১৫ দলকে কোচিং করাতে শুরু করলেন।

জেরার্ডের বয়স তখন ১৯ পেরোয়নি; নিজের নামে একাডেমি চালু করার সাহস দেখালেন। জেরার্ড জোন্স স্কুল অফ ফুটবল- জেরার্ডের হাতে গড়া ফুটবল কোচিং প্রতিষ্টানটি এতো ব্যাপকভাবে দারুণ সফল হলো যে ২০১০ সালে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের সেরা ১০০ স্টার্টাপের একটি হয়ে দাঁড়ালো!

প্রিমিয়ার লীগের সহায়তায় আর্সেনাল এফসি’র যুব উন্নয়ন প্রজেক্ট ‘আর্সেনাল সকার স্কুল’ এর সাথে যুক্ত হন মাত্র ২১ বছর বয়সে!

জেরার্ড জোন্স তার ম্যানেজারিয়াল ক্যারিয়ারে সামলেছেন ইংল্যান্ডের বেশ কিছু ক্লাব। স্থানীয় ক্লাব কেইলেগ এএফসি, সহকারী ম্যানেজার হিসেবে ব্রাডফোর্ড এফসির অনুর্ধ-২১ দল, রসডেল এফসি, হেড অফ কোচিং হিসেবে ব্রিষ্টল রোভার্স কিংবা রিচমন্ড সকার একাডেমিক এন্ড সকার একাডেমির দায়িত্ব সামলেছেন অত্যন্ত কম বয়সে!

২০২০ সালে ব্রিস্টল রোভার্স ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন মরক্কোতে; রয়েল মরোক্কান ফুটবল ফেডারেশনের এলিট কোচ এডুকেটর (প্রশিক্ষক) হিসেবে যোগ দিতে। তারপর MLS এর ক্লাব স্পোর্টিং ক্যানসাস সিটির ডিরেক্টর অফ কোচিং এর দায়িত্ব নিয়ে চলে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন জেরার্ড জোন্স; তারপরের গন্তব্যে কম্বোডিয়ান ক্লাব ভিশাকায়। সেখান থেকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে!

জে. জোনসের উয়েফা ‘এ’ লাইসেন্স, ইউএসএসএফ ‘বি’ লাইসেন্স রয়েছে এবং পাশাপাশি তিনি ইউএস সকারের কোচ প্রশিক্ষক ও উয়েফা কোচ ডেভেলপারও বটে! জেরার্ড জোন্স বর্তমানে পিএইচডি ডিগ্রি করছেন, মাষ্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন দুইবার। একবার পারফরম্যান্স কোচিংয়ে, দ্বিতীয়বার স্পোর্টস ডাইরেক্টরশীপে।

বাফুফে’তে তাকে যে মিশন ও ভিশন সামনে রেখে আনা হয়েছিলো, তার দৃশ্যমান অগ্রগতি আমরা মাস দিন পরেই বুঝতে পারছি। কয়েকটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটি স্পষ্ট হবে;

  • অনুর্ধ-১৭ ও ২০ দলের হেড কোচ হিসেবে এই দল দুটি নিয়ে কাজ করা; আগামীর খেলোয়াড় তৈরিতে এই দুটি দল ভূমিকা পালন করবে নিঃসন্দেহে।
  • ওরিজিন খেলোয়াড়দের শতভাগ অগ্রাধিকার দেয়া।
  • মিডিয়া বায়াসনেস ও সিন্ডিকেটের বলয়কে বুড়ি আঙ্গুল দেখানো। (চলমান প্রক্রিয়া, তবে জোন্স চেষ্টা করে যাচ্ছেন)
  • শুধুমাত্র দল গঠনেই ক্ষান্ত নন জোন্স, বরং যুব খেলোয়াড়দের প্রজন্মটাই বদলে দিতে নিরলস কাজ করে চলেছেন।

জে. জোন্স ফেইসবুকে বেশ এক্টিভ, এবং নিয়মিতই লেখালেখি ও ভিডিওবার্তার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেন- যা একটি ঐতিহাসিক ব্যাপার। এর আগে কখনোই কোনো কোচকে এটা করতে দেখিনি আমরা।

পাশাপাশি, ভক্তদের আশাভরসার কথাও শুনেন- সেগুলোর পক্ষে-বিপক্ষেও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন- এই বিষয়টি জোন্সকে আলাদা করে তুলেছে অন্য যে কারো থেকে।

এখন পর্যন্ত জোন্স হচ্ছেন বাফুফের সেরা সাইনিং; যার মাধ্যমে বদলে যেতে পারে একটা গোটা জেনারেশন। হয়তো আজ- কাল এই ফলটি আসবেনা, তবে আগামীতে নিশ্চিত আজকের কাজগুলো-ই অনুকরণমূলক হয়ে থাকবে।

জোন্সের ব্যাপারে একটা কথা মোটামুটি নিশ্চিত, তিনি চাচা-মামায় বিশ্বাসী না। তার দলে খেলতে হলে আপনাকে নিজের যোগ্যতায়ই খেলতে হবে। যদি আপনি বিদেশে জন্ম নিয়ে নিয়মিত খেলাধুলা করে থাকেন, কিন্তু কোনো দলে সূ্যোগ পাচ্ছেন না- তার মানে আপনার নিশ্চয়ই কোথাও ঘাটছি আছে।

তবে হ্যাঁ, আপনি যদি ক্যাপাবল হন তাহলে জেরার্ড জোন্সই আপনাকে প্রথমে ডাকবেন; এটা নিশ্চিত। গতকাল তার লিংকডইন পোস্ট দেখে এ কথা আরোও জোড়ালোভাবে বলা যায়।

বাংলাদেশের ফুটবলের মূল যে সমস্যা- কোনো পাইপলাইন নাই, অবকাঠামোগত কোনো উদ্যোগ নেই। খেলোয়াড় বেরিয়ে আসার রাস্তাটাই বন্ধ; ঠিক সেখানেই এই কয়দিনে হাত দিয়েছেন জোন্স। আপাতত হিসেবের খাতাটা শূন্যে; তবে তাকে কাজ করতে দিলে এ দেশের ফুটবল এক ভিন্ন উচ্চতায় যে পৌঁছাবে, তা এখনি আন্দাজ করতে পারি। জোন্সই হবেন আগামীর তারকা বানানোর ম্যাজিকম্যান..

  • আহমদ আতিকুজ্জামান।

জনপ্রিয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *