ফুটবলে কিছু ছবি শুধু ছবি হয়ে থাকে না। সময় পেরিয়ে গেলে সেগুলো হয়ে ওঠে একটি সময়ের দলিল। একটি প্রজন্মের গল্প। একটি ভূখণ্ডের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের দৃশ্যমান স্মারক।
এই ছবিটিও তেমন।
চারজন তরুণ দাঁড়িয়ে আছেন পাশাপাশি। গায়ে বাংলাদেশের জাতীয় দলের সাদা জার্সি। সামনে তাকিয়ে আছেন প্রত্যেকে নিজের মতো করে। কিন্তু ছবির বাইরে তাদের গল্পগুলোকে পাশাপাশি রাখলে একটি অদৃশ্য রেখা চোখে পড়ে। সেই রেখা গিয়ে মিশেছে সিলেটে।
বাঁ থেকে সাদ উদ্দিন, শমিত সোম, হামজা চৌধুরী ও ফারহান আলী ওয়াহিদ।
চারজনের জন্মস্থান এক নয়। বেড়ে ওঠার পরিবেশও এক নয়। ফুটবলে উঠে আসার পথও আলাদা। কেউ সিলেটের স্থানীয় মাঠে বল পায়ে দৌড়েছেন। কেউ হাজার মাইল দূরে জন্ম নিয়ে পরিবারের শেকড় খুঁজে ফিরেছেন। কেউ ইংল্যান্ডের ফুটবল সংস্কৃতিতে তৈরি হয়ে মায়ের জন্মভূমির হয়ে খেলতে এসেছেন। আর কেউ এখনো ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে।
তবু তাদের গল্পের ভেতরে একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে।
সিলেট।
বাংলাদেশের ফুটবলে এই চারটি নামকে তাই শুধু চারজন খেলোয়াড় হিসেবে দেখলে গল্পের অনেকটা অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। তাদের গল্পের ভেতরে আছে একটি অঞ্চলের মাটি, প্রবাসে ছড়িয়ে পড়া মানুষের ইতিহাস, শেকড়ের প্রতি টান এবং ফুটবল নামের সেই আশ্চর্য শক্তি, যা দূরত্বকে কখনো কখনো খুব ছোট করে দেয়।
সাদ উদ্দিনের গল্পটি শুরু হয়েছিল একেবারে ঘরের মাঠ থেকে

সাদ উদ্দিনের গল্পে দূরত্ব কম। বরং আছে কাছ থেকে উঠে আসার সৌন্দর্য।
দক্ষিণ সুরমার কুচাই। সেখানকার মাঠে ফুটবল খেলতে খেলতেই বড় হয়েছেন সাদ। তখন জাতীয় দলের জার্সি অনেক দূরের স্বপ্ন। টেলিভিশনের পর্দায় জাতীয় দলের খেলা দেখা আর নিজের পায়ে বল নিয়ে মাঠে ছোটা ছিল দুই ভিন্ন পৃথিবী।
কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্যই হলো, কখনো কখনো এই দুই পৃথিবীর মাঝখানে খুব বেশি দূরত্ব থাকে না।
স্থানীয় ফুটবল থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের একাডেমি, বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে জাতীয় দলের দরজা। সাদের পথটি তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে। কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে জাতীয় দলের ফুটবলার হয়ে যাওয়ার গল্প এটি নয়। বরং প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
জাতীয় দলে সাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর বহুমুখিতা। রক্ষণে খেলতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে আক্রমণেও উঠে যেতে পারেন। মাঠে তাঁর দৌড়ের মধ্যে সেই স্থানীয় ফুটবলের ছাপ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়। বল হারালে ফিরে আসা, জায়গা তৈরি করা, দলের প্রয়োজন বুঝে নিজের অবস্থান বদলে নেওয়া। এসবই একজন ফুটবলারের পরিণত হওয়ার গল্প বলে।
কিন্তু সাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটি অন্য কোথাও।
কুচাইয়ের যে মাঠে তিনি একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেখানকার কোনো এক কিশোর হয়তো আজও তাঁকে দেখে ভাবে, একদিন সেও জাতীয় দলের জার্সি পরবে।
সাদ সেখানে শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি একটি সম্ভাবনার নাম।
শমিত সোমের গল্পে আছে দূরদেশ থেকে ফিরে আসার টান

শমিত সোমের গল্পটা আরও দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছে।
জন্ম কানাডায়। বেড়ে ওঠা সেখানেই। ফুটবলের শিক্ষা কানাডার মাঠে। পেশাদার ফুটবলের অভিজ্ঞতাও কানাডার ফুটবল কাঠামোতে।
তারপরও তাঁর গল্পের ভেতরে সবসময় ছিল একটি দূরের ঠিকানা।
শ্রীমঙ্গল।
পরিবারের শেকড় সেখানে। যে মাটিতে তাঁর নিজের শৈশব কাটেনি, সেই মাটিই তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বড় হওয়া একজন মানুষের কাছে শেকড়ের অর্থ কখনো কখনো খুব অদ্ভুত। আপনি হয়তো সেই রাস্তাগুলোতে খেলেননি, সেই মাঠে দৌড়াননি, সেই স্কুলে পড়েননি। তবু জায়গাটির সঙ্গে আপনার এক ধরনের আত্মীয়তা থেকে যায়।
শমিতের ক্ষেত্রে ফুটবল সেই আত্মীয়তাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
কানাডার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অভিজ্ঞতা থাকার পরও বাংলাদেশকে বেছে নেওয়া তাঁর ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামার পর সেই সিদ্ধান্ত আর শুধু কাগজে লেখা একটি আনুষ্ঠানিকতা থাকেনি। সেটি হয়ে উঠেছে পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের একটি সংযোগ।
শমিত যখন বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন, তখন তাঁর সঙ্গে শুধু একজন কানাডিয়ান ফুটবলারের অভিজ্ঞতা আসে না। আসে একটি সিলেটি পরিবারের বহু বছরের প্রবাসজীবনের গল্পও।
এই জায়গাটিই শমিতকে আলাদা করে।
তিনি বাংলাদেশে এসেছেন শুধু ফুটবল খেলতে নয়। এসেছেন নিজের পারিবারিক গল্পের আরেকটি অধ্যায় লিখতে।
হামজা চৌধুরী যেন দুই পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ফুটবলার

হামজার গল্পে সিনেমার উপাদান আছে। তবে তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ফুটবলের বাইরের জায়গায়।
ইংল্যান্ডে জন্ম। ছোটবেলায় লেস্টার সিটির একাডেমিতে যোগ দেওয়া। তারপর পেশাদার ফুটবল। প্রিমিয়ার লিগের মাঠ। ইংল্যান্ডের ফুটবল সংস্কৃতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর মধ্যে দিয়ে উঠে আসা।
একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারের জন্য এর চেয়ে বড় মঞ্চ খুব বেশি নেই।
কিন্তু সেই গল্পের অন্য পাশে ছিল হবিগঞ্জ।
মায়ের শেকড় বাহুবলের স্নানঘাটে। দূর ইংল্যান্ডের ফুটবল মাঠে বড় হতে থাকা এক শিশুর জীবনে হয়তো সেই গ্রামের স্মৃতি প্রতিদিনের বাস্তবতা ছিল না। কিন্তু পরিবার, ভাষা, সংস্কৃতি এবং গল্পের ভেতর দিয়ে সেই শেকড় বেঁচে ছিল।
তারপর একদিন ফুটবল তাঁকে সত্যিই সেখানে ফিরিয়ে আনল।
হামজার বাংলাদেশে আসা, সিলেটে যাওয়া, হবিগঞ্জের গ্রামে মানুষের ভিড়, তাঁকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আবেগ, এসব দৃশ্য ছিল বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের একটু ভিন্ন ধরনের মুহূর্ত।
সাধারণত একজন ফুটবলার মাঠে নামলে তাঁর পরিচয় হয় জার্সি দিয়ে। হামজার ক্ষেত্রে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি ভূগোলও।
লেস্টার থেকে সিলেট।
প্রিমিয়ার লিগ থেকে বাংলাদেশের জাতীয় দল।
ইংল্যান্ডের ফুটবল একাডেমি থেকে হবিগঞ্জের গ্রামের রাস্তা।
দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পৃথিবীর মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা হামজার গল্প আসলে প্রবাসী বাঙালিরও গল্প। যে মানুষ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে জীবন তৈরি করেছে, কিন্তু নিজের ভেতর কোথাও একটি পুরোনো ঠিকানা রেখে দিয়েছে।
আর সেই ঠিকানার নাম সিলেট।
ফারহান আলী ওয়াহিদ এখনো গল্পের শুরুতে

চারজনের মধ্যে ফারহান আলী ওয়াহিদের গল্পটি সবচেয়ে নতুন।
তাঁর সামনে এখনও দীর্ঘ পথ। অনেক কিছুই হওয়ার বাকি।
ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা ফারহান ফুলহামের একাডেমিতে নিজের ফুটবল পরিচয় তৈরি করেছেন। ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন তরুণ হিসেবে তাঁর সামনে সুযোগের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়।
জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য খুলেছে আরও সম্প্রতি।
এখানে ফারহানের গল্পকে হয়তো এখনই কোনো পূর্ণাঙ্গ গল্প বলা যাবে না। এটি এখনও প্রথম কয়েকটি অধ্যায় মাত্র। কিন্তু একজন সাংবাদিকের চোখে এখানেই গল্পটির আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি।
কারণ আমরা জানি না পরের অধ্যায়ে কী লেখা আছে।
আমরা শুধু জানি, একজন তরুণ ফুটবলার ইংল্যান্ডের মাঠ থেকে বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সিতে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিলেটের শেকড়। আর তাঁর সামনে এখন নিজের গল্পটি নিজের মতো করে লেখার সুযোগ।
হয়তো কোনো একদিন এই ছবিটির দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, চারজনের মধ্যে সবচেয়ে কম অভিজ্ঞ মুখটিই নিজের জন্য সবচেয়ে বড় অধ্যায় লিখে ফেলেছেন।
ফুটবলে ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।
শুধু অপেক্ষা করা যায়।
চারজনের গল্প আলাদা, কিন্তু ছবিটি একটি
একজন কুচাই থেকে উঠে এসেছেন।
একজন কানাডা থেকে ফিরে এসেছেন পরিবারের শেকড়ের কাছে।
একজন ইংল্যান্ডের ফুটবল পেরিয়ে মায়ের জন্মভূমির জাতীয় দলের জার্সি পরেছেন।
আর একজন ইংল্যান্ডের ফুটবল কাঠামো থেকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে আসছেন। তাদের পথ আলাদা। তাদের শৈশব আলাদা। তাদের ফুটবল শিক্ষাও আলাদা।
কিন্তু জাতীয় দলের জার্সি মানুষকে অনেক কিছু ভুলিয়ে দেয়। তখন ক্লাবের পরিচয় থাকে না, পাসপোর্টের গল্প থাকে না, কে কোথায় বড় হয়েছে সেই হিসাবও থাকে না। মাঠের ভেতর একজন ফুটবলারের পরিচয় একটাই।
ফুটবল আমাদের প্রায়ই বলে, একটি গোলের আগে অনেকগুলো পাস থাকে। একটি জাতীয় দলের পেছনেও তেমন অনেক গল্প থাকে।
সে বাংলাদেশের হয়ে খেলছে। আর এই চারজনের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা সম্ভবত সেখানেই।
সিলেট বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন কোনো শব্দ নয়। এই অঞ্চলের মাঠে বহু বছর ধরেই ফুটবল খেলা হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ফুটবলও বদলেছে। মানুষের জীবন বদলেছে। সিলেটের মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা দেশে। তাদের সন্তানরা জন্ম নিয়েছে লন্ডনে, টরন্টোতে, লেস্টারে কিংবা অন্য কোনো শহরে।
শেকড় অবশ্য সেখানেই রয়ে গেছে। ফুটবল সেই শেকড়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক তৈরি করার একটি ভাষা হয়ে উঠেছে।
সাদ সেই মাটির সন্তান, যে স্থানীয় মাঠ থেকে জাতীয় দলের দরজায় পৌঁছেছেন। শমিত সেই প্রবাসী প্রজন্মের প্রতিনিধি, যার কাছে শেকড় মানে পরিবারের গল্প এবং একটি পুরোনো ভূগোল।
হামজা সেই গল্পের সবচেয়ে দৃশ্যমান চরিত্র, যিনি বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চ থেকে ফিরে এসে নিজের পারিবারিক মাটিতে মানুষের ভালোবাসা দেখেছেন।
আর ফারহান সেই গল্পের পরের অধ্যায়, যার শেষ কোথায় তা এখনও কেউ জানে না। হয়তো এ কারণেই ছবিটা এত অর্থবহ।
চারজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। কারও মুখে আত্মবিশ্বাস, কারও চোখে প্রত্যাশা, কারও ভঙ্গিতে অভিজ্ঞতার ছাপ। কিন্তু চারজনের গায়ে একই জার্সি। বাংলাদেশের।
আর ছবিটির পেছনে যে সবুজ, সেটিও কেবল একটি নান্দনিক পটভূমি নয়। একটু দূর থেকে তাকালে মনে হয়, চারজন মানুষ যেন নিজেদের গল্প নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একটি বৃহত্তর ভূগোলের সামনে।
সেই ভূগোলের নাম সিলেট। কেউ স্থানীয় মাঠ থেকে আসে।কেউ আসে প্রবাস থেকে। কেউ আসে পরিবারের স্মৃতি বুকে নিয়ে। কেউ আসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে। সাদ, শমিত, হামজা ও ফারহান সেই চারটি গল্পের চারটি আলাদা অধ্যায়।
আর তাদের একসঙ্গে দাঁড় করালে যে গল্পটি তৈরি হয়, সেটি শুধু জাতীয় দলের গল্প নয়। এটি সিলেটের গল্প। এটি শেকড়ের গল্প। এটি দূরত্ব পেরিয়ে ফিরে আসার গল্প। সবচেয়ে বড় কথা, এটি ফুটবলের গল্প।
কারণ ফুটবল কখনো শুধু এগারোজনের খেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শহর, গ্রাম, পরিবার, প্রবাস, স্মৃতি আর মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা।
সিলেট সেই অপেক্ষার একটি নাম। আর লাল সবুজের জার্সিতে এই চারজন সেই অপেক্ষার নতুন চারটি মুখ।