হিলসবরো থেকে পিলখানা…

শেফিল্ডের হিলসবরো স্টেডিয়ামের সাথে পিলখানার দূরত্ব কতটুক, ১৯৮৯ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যবর্তী সময়কার ব্যপ্তি দীর্ঘ কতখানি?

১৫ এপ্রিল আর ২৫ ফেব্রুয়ারিতে কোনো ফারাক আছে কি? কিংবা ৯৭ থেকে ৫৭ সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য ঠিক কত- সংখ্যার মারপ্যাঁচে আর হিসেবনিকেশে পর্যুদস্ত দিকবিদিকশুন্য নাগরিকের মগজে কিলবিল করতে থাকা প্রশ্নবাণের রহস্যময় জট খুলতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ কাজ করছেনা।

তবু সহজ সমীকরণে, অবলীলায় বলি- শেফিল্ডের হিলসবরো স্টেডিয়ামের সাথে ঢাকার পিলখানার কোনো মিল নেই।

মিল নেই দুটি ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন দুটি জায়গায় ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনার। হিলসবরো’তে সেদিন বিকেলে খেলা দেখতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি ৯৪ জন মানুষ; আর পিলখানার দরবারে সাতসকালে ৫৭!

আমি আবারো বলছি- এই দুটো ঘটনার দুটো ভিন্ন সময়ের সাক্ষী। একটির সাথে আরেকটির বিন্দুমাত্র মিল নেই।

১৫ এপ্রিলে যে ৯৪ জন অকালে হারিয়ে গেলেন, তারা লিভারপুল- নটিংহ্যামের খেলা দেখতে হিলসবরোতে হাজির হয়েছিলেন।

আর ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারিতে যারা হারিয়ে যাচ্ছিলেন- তারা জানতেনই না তাদের সাথে কি খেলাটাই না ঘটতে চলেছে।

একটা জায়গায় অবশ্য এই দুটো ঘটনার কিছুটা মিল আছে। পরিকল্পনা। দুটো ঘটনাই ঘটেছে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে।

হিলসবরোর দায়িত্বে থাকা ডেভিড ডাকেনফিল্ডের পরিকল্পনা ছিলো ভুল। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভুল। দায়িত্বে করেছিলেন অবহেলা।

আর পিলখানায়?
কে ছিলেন দায়িত্বে, কার নেতৃত্বে ঘটলো এই ঘটনা; কলকাড়ি নাড়ালো কারা আর সিদ্ধান্তই বা ছিলো কার?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অমীমাংসিত।

হিলসবরো’তে আপনজন হারানোদের বলা হলো- এটা স্রেফ একটা দুর্ঘ-টনা বৈ কিছু না। আর পিলখানায়- ডালভাত নিয়ে অসন্তোষ!

শেফিল্ডের মানুষেরা ব্যাপারটা মানলেন না। মানতে পারলেন না। এটা কোনোভাবেই স্রেফ একটা দুর্ঘ-টনা হতে পারে না- তারা কোর্ট কাচারিতে দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত হতে শুরু করলেন। ন্যায়বিচা:র না পাওয়া পর্যন্ত ক্লান্ত শরীরকে বিশ্রাম না দেয়ারও প্রতিজ্ঞাও নিলেন।

একবার, দুইবার, তিনবার। কোর্টরুমে তাদের যাওয়া আসার সংখ্যাটা শতবার ছাড়িয়ে যায়। বারবার ফিরে আসেন তারা। অসহায়, ক্রন্দনোন্মুখ হয়ে। তবু আশা ছাড়েন না।

১৯৮৯ থেকে ২০১৬।
২৭ বছরের ব্যবধান। সত্য বনাম রাষ্ট্র মুখোমুখি অবস্থানে। মিথ্যাচারের খেলা চলে। সত্য গোপনের মহড়ায় পড়ে সময়চক্র।

তারপর সব বাঁধা পেরিয়ে; মাঠি ফুঁড়ে বের হয়ে আসা সবুজ গাছের চারার মতো চেশায়ারের আদালত রাষ্ট্রের বিপক্ষে সত্যকে তুলে নিয়ে আসে জনসমক্ষে। ঘোষণা আসে, রায় হয়- ওটা কেবলই একটা দুর্ঘ-টনা ছিলোনা। ছিলো চরম অবহেলা, নতি পরিবর্তন ও তথ্য গোপণের অপরা-ধ। এক্সিডেন্টাল-ডেথ নয়, সেদিন ছিলো আনল’ফুল-কিলিং!

পিলখানার ঘটনায় জড়িতদের ৪৮ ঘন্টার ভেতর সামনে আনার কথা থাকলেও, পঞ্জিকার হিসেবে আজ ১৭ বছরে পা দিলো।

ডালভাত নিয়ে বিদ্রো-হ করা জওয়ানরা নিজেরাই নিজেদের উর্ধ্বতন কর্মকতাদের খেয়ে ফেলেছেন- এর পিছনে আর কোনো রহস্যে নাই; এতটুক ছাড়া আর বেশি বলতে পারেনি কেউই।

হিলসবরোর সাথে পিলখানার আরোও দুটি মিল আছে।

১) হিলসবরোর ঘটনায় জড়িত থাকা ও প্রমাণিত হওয়ার পরও ডেভিড ডাকেনফিল্ডের মতো মানুষেরা বিশেষ কোনো শাস্তি*র সম্মুখীন না হয়েই যেমন খালাস পেয়েছেন; তেমনি পিলখানার সাথে জড়িত কেউকেউ বিচারের কাঠগড়ায় গিয়েও হাসিমুখে ফিরে এসেছেন। তবে মূল কুশিলবেরা আদালত- জেলহাজতে দূরে থাক- তাদের নাম পর্যন্ত কখনো মিডিয়ার সামনেই আসেনি।

২) হিলসবরোর ঘটনায় ইয়র্কশায়ার পুলিশ দোষী সাব্যস্ত হয়; কিছু মানুষ জেলে যায়। পিলখানার ঘটনায় কোনো বাহিনীকেই দায়ি করা হয় না; বাহিনীগুলোকে পরিচালনা করা লোকেরাই একসময় বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন। আর হাজারে হাজারে জেলে যায় সাধারণ জওয়ানেরা- যারা বিন্দুমাত্র এইসবে জড়িত না!

হিলসবরোর ঘটনা আমাদেরকে একই সাথে দুটো শিক্ষা দেয়।

  • ন্যায়বিচার পাওয়া দুষ্কর; তবে সত্য অবশ্যম্ভাবী।
  • সত্য বনাম রাষ্ট্রের অসম লড়া:ই হলেও সত্য জয়ী হবে।

আজ ২৫ ফেব্রুয়ারী। পিলখানা হ-ত্যা-যজ্ঞের ১৭ বছর।
এই ১৭ বছরেও যে সত্য প্রকাশ হয়নি- তা যে কখনোই প্রকাশ হবেনা, আমি তার ঘোর বিপক্ষে অবস্থান নেই।

হিলসবরোর ২৭ বছর পর যদি ন্যায়বিচার পাওয়া যায়; সত্য যদি বেরিয়ে আসে দুই যুগেরও পরে- তাহলে পিলখানার হিসেবটাও একদিন চুকিয়ে দিবে এই রাষ্ট্রযন্ত্র।
আমি সেই আশাই দেখি।

লিভারপুলের ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক এলোন’ স্লোগান কেবলই একটা স্লোগান নয়; এটি একটি শপথ। পিলখানার জন্যও আমাদের এই স্লোগান হোক- ‘ইউ আর নেভার ফরগেটেন’

হিলসবরোর ‘জাস্টিস ফর দ্যা নাইন্টি সেভেন’ ক্যাম্পেইন পিলখানার ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তার জন্যও হোক- ‘জাস্টিস ফর ফিফটি সেভেন।’

পিলখানায় শহীদ-হওয়া সকল দেশপ্রেমী সেনা কর্মকর্তার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। আরো দশ বছর পরে হলেও যেন আমরা জানতে পারি, তারা কেন অকালে-পরলোকগামী হলেন…

জনপ্রিয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *