একজন মানব পাচারকারী, যৌন নিপীড়ক, প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক প্রতারক, চরিত্রহীন লম্পট কিংবা পতিতাবৃত্তির আশ্রয়ক, মিথ্যুক। অর্থ পাচারক
নাকি নর্দমার কিট, পরাজিত ফ্যাসিস্টের দোসর? নাকি চোখের সামনে পালিয়ে বেড়ানো দাগি আসামি?
ঠিক কোন বিশেষনে ভদ্রলোককে বিশ্লেষণ করা যায়, তা নিয়ে আমি দ্বিধাদ্বন্দে পড়ার বিশেষ সুযোগ পেলাম না। কারণ, উপরের সবগুলো গুন-ই একজন ব্যক্তির আমলনামায় ইতিমধ্যে যোগ হয়ে গিয়েছে। অগত্যা বাধ্য হয়ে তার ফিরিস্তি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার তীব্র বাসনা কেবল অন্তরে না পোষে বরং আপামর বাঙালির কাছে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিলাম। আপনারা পড়ছেন ‘একজন অপরাধীর মনের গঠন’ এবং তার লাস্যময়ী যে পাপের পাহাড়!
মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। বাংলাদেশ পেশাদারি বক্সিংয়ের এক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তার বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছে, যা কেবল একজন দুর্দান্ত ক্রিমিনাল মাষ্টারমাইন্ডের দ্বারাই সম্ভব। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে যিনি করে যাচ্ছেন একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, আর প্রচন্ড দাপটে রাজত্ব করছেন পুরো একটি ইন্ডাস্ট্রি। আমি র্যাপিড একশন ব্যাটেলিয়ন, ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই) ও বাংলাদেশ পুলিশ এর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই- বাংলাদেশ থেকে পালানোর আগে আপনারা এই ক্রিমিনাল মাষ্টারমাইন্ডকে গ্রেফতার করে আইনের আওয়ায় নিয়ে আসুন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা সকল তথ্য আমি আপনাদের দিয়ে সাহায্য করতে রাজি আছি।
অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু : এনাটমি অফ আ ক্রিমিনাল।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যাদি : মানব পাচার, অর্থ পাচার, মামলার আসামী, যৌন নিপীড়ন, অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাংক ফ্রড, কন্ট্রাক্ট জালিয়াতি, ফ্যাসিস্ট এফিলিয়েশন ও বিবিধ।
পাপের পাহাড় গড়ে তোলা আসাদের পাহাড়ের পাদদেশ থেকেই তবে শুরু করা যাক।
ভদ্রলোকের নাম মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। একাধারে তিনি এএফ বক্সিং প্রমোশন এর কর্ণধার, বাংলাদেশ প্রফেশনাল বক্সিং সোসাইটির চেয়ারম্যান, ওয়ার্ড বক্সিং কাউন্সিলের ‘কমিশনার’, সাবেক সেনা সদস্য, ও শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের আস্থাভাজন।
বাহারী সব পরিচয়ের আড়ালে সবসময় অন্য আরেকটা মুখোশ পড়ে থাকেন আসাদ, যা তাকে সমাজে একজন ভয়ংকর অপরাধী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে দিনকে দিন।
আর্মস টেকনিশিয়ান হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি শুরু, উশৃঙ্খলতা সৃষ্টির দায়ে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে চলে যাওয়া- আসাদুজ্জামানের জীবনটাই যেন একটা সিনেমা। গুরুত্বপূর্ণ আর্মস সোলজার হিসেবে নিজেকে জাহির করতে সময়ে সময়ে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলাকেও বুড়ো আঙ্গুল দেখাতেন। এজন্য বেশ কয়েকবার ক্যান্টনমেন্টেই অপদস্ত হয়েছেন। শেষমেশ তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
দেশত্যাগ করে আমেরিকায় পাড়ি জমান আসাদ, আমেরিকান নেভীতে কিছুদিন কাজ করেন শেফের এসিস্ট্যান্ট হিসেবে। সেখান থেকে লিথুয়ানিয়া; কখনো কুয়েত কখনো কলম্বিয়া; মেক্সিকো থেকে পানামা, দুবাই থেকে ভেনিজুয়েলা! আসাদের রহস্যময় যাত্রা যেন এক বিহ্ববল যাযাবরের মতো।
জুলাইয়ের পরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা দিয়ে আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই।
বুধবার, নভেম্বর ২৯, ২০২৪।
বাংলাদেশ প্রফেশনাল বক্সিং সোসাইটি ভবন। বক্সিং সোসাইটির আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন। জমকালো আয়োজন, রবিন মিয়ার জন্য উপলক্ষটা বেশ আনন্দঘন। প্রায় দুই বছর পর শুক্রবারে রিং-এ ফিরবেন তিনি। আয়োজক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানালেন, রবিন মিয়া গত দুই বছর ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে এবার রিংয়ের লড়াইয়েও জিতবেন। অথচ রবিন মিয়াকে জিজ্ঞেস করে দেখা গেলো এর কিছুই জানেন না তিনি। তার নামের পাশে ক্যান্সার আক্রান্তের খবর কিভাবে জুড়ে গেলো তাও তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না!
আসাদুজ্জামান মিডিয়ার সামনে এমন ভণ্ডামি আর মিথ্যা স্ট্যান্টবাজি, প্রতারণা অহরহ-ই করে থাকেন।
সর্বশেষ এই ২ সপ্তাহ আগেও আসাদ যে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মিডিয়া স্ট্যান্ট করেছেন, তাতে তাকে গ্রেফতার দূরে থাক- জবাবদিহিতার রাডারেও নিয়ে আসা হয়নি।
লাতিন বাংলা সুপারকাপ ২০২৫ নামে টুর্নামেন্ট আয়োজন করে আসাদের AFB promotion, যেখানে ‘গোড়া থেকে আগা’, ভুলে ভরা নীতি আর অপেশাদারিত্ব- অব্যবস্থাপনায় শেষপর্যন্ত আয়োজন ভেস্তে গেছে। আর্জেন্টিনা দল বাংলাদেশে আটকে ছিলো ফ্লাইট টিকেটের জন্য, বাংলাদেশের ইংল্যান্ড প্রবাসী দুই খেলোয়াড়ও যেতে পারেন নি ফিরে টিকেট জটিলতায়। হোটেলে পাওয়া প্রায় ২ কোটি টাকা, দেশী খেলোয়াড় কোচিং প্যানেল সবার টাকাই বকেয়া। তবু আসাদ বহাল তবিয়তেই আছেন। ঠিক কিভাবে, কোন ক্ষমতাবলে তিনি আজকের এই আসাদ হয়ে উঠলেন তা জানতে হলে আমাদেরকে কিছুটা পিছনে যেতে হয়।
পৈত্রিক নিবাস রাজবাড়ী ছেড়ে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেও স্ত্রী সন্তানদের রাজবাড়ীতেই রেখেছিলেন আসাদ। তার স্বপ্নের ডানা মেলানোর অভিপ্রায় একসময় তাকে নিয়ে গেছে অপরাধ জগতের বিভিন্ন অলিগলিতে। আর্মিতে যোগ দেয়ার আগে থেকেই শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। আসলাম ‘৯৭ তে জেলে গেলেও আসাদ তার নেটওয়ার্কের আশেপাশেই ঘুরাফেরা করতে থাকেন।
একসময় মার্ডার কেইসের সাথে জড়িয়ে গেলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে পাড়ি জমান কুয়েতে। আর সেখানেই এক নতুন নিজেকে খুঁজে পান আসাদুজ্জামান। তার সাথে পরিচয় ঘটে এক ফিলিপিনো নারীর, যার নাম ক্লিনেথ মনটন। দেশে বৌ বাচ্চা থাকার পরও ঐ নারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান আসাদ।
ক্লিনেথের সঙ্গে ২০২০ সালে ফিলিপিন গিয়ে তাকে বিয়েও করেন এবং বর্তমানে তাদের একটি ছেলে সন্তানও আছে। বিয়ের পর ক্লিনেথের নাম হয়ে যায় ফাতেমা। ফাতেমাকে বিয়ে করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো একটাই; তার বক্সিং প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ভাগিয়ে নেয়া।
ফাতেমা (ক্লেনিথ মনটন) ২০১৫ থেকে GAB (Games & Amusement Board) ফিলিপাইন থেকে লাইন্সেন্স নিয়ে পেশাদার বক্সিং পরিচালনা করে আসছিলেন। আসাদ তার এই লাইসেন্স কৌশলে শুধু নিজের নামেই করে নেন নি, বরং বাংলাদেশে ফিরে NSC (National Sports Council) এর মাধ্যমে বাংলাদেশে পেশাদার বক্সিংয়ের আয়োজক/প্রমোটর এর পার্মিশন নিয়ে নেন। এবং সে প্রতিষ্টানের নামকরণ করেন AF Boxing promotion। AF এর A এসেছে আসাদ থেকে, F এসেছে ফাতেমা থেকে; খোদ তার ফিলিপিনো স্ত্রী আমাকে নিশ্চিত করেছেন।
ফিলিপাইন থেকে ফিরে আসার আগে স্ত্রীর প্রতিষ্ঠান, লাইসেন্স এবং পারিবারিক ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে ৪টি ভিন্ন ব্যাংক থেকে ২ মিলিয়ন ফিলিপিনো পেসো ঋণ আসেন আসাদ। উদ্দেশ্য ছিলো একটাই, বাংলাদেশে ফিরে এসে এই টাকা বক্সিংয়ে বিনিময় করা। আসাদ কেবল ফিলিপাইনের ২ মিলিয়ন পেসো ঋণখেলাপীই নন, বরং কুয়েতে থাকাকালীন ৭০৫০ দিনার এবং দুবাইয়ে ৩০ হাজার দিরহাম ঋণ নিয়েছেন বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ব্যাবহার করে। যেগুলো আজও পরিশোধিত হয়নি।
২০২০ সালে বাংলাদেশে শুরু করেন AF Boxing Promotion নামের এই প্রতিষ্ঠান। এখানে তার সাথে যুক্ত হন সুহেল তাজ। যিনি ইতিমধ্যই ফিটনেস নিয়ে কাজ করা শুরু করেছেন। সুহেল তাজের সাথে আসাদের সখ্যতা গড়ায় বহুদূর। জিম থেকে বক্সিং, কম্বেট থেকে এমএমএ রেসলিং- সুহেল তাজ ভরসার জায়গা হয়ে উঠেন আসাদের। সুহেল তাজের সহযোগিতায় রাজধানীর আফতাবনগরে গড়ে তোলেন আসাদ বক্সিং এরেনা; যেটি দেশের প্রথম বক্সিং এরেনা এবং ট্রেইনিং সেন্টার। ৭ তলা ভবনের পুরোটাই ভাড়া নিয়ে নেন আসাদ।
আফতাবনগরের বাড়ি নং ৪৪, রোড নং ০১, সেক্টর-২, ব্লক ডি এর বাড়িটি কেবলই বক্সিং ট্রেইনিং সেন্টার নয়; বরং তারচেয়েও অনেক বেশি কিছু।
বক্সার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ট্রেনিং করতে আসা তরুণ তরুণীদের আসাদ বিভিন্ন উপায়ে হয়রানি করেন। আমার অনুসন্ধানে ২ জন মেয়ের জবানবন্দি রয়েছে, যারা আসাদের সরাসরি যৌন নিপীড়নের স্বীকার হয়েছেন।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা এক বক্সারের ‘ব্রা সাইজ কত, ব্রেস্টের সাইজ কত?’- এইসব প্রশ্নও করেছে অফিসে ডেকে নিয়ে। অন্য আরেকজন বক্সারকে তার সাথে শুয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করা শর্তে বক্সিং সোসাইটির এক কর্মকর্তাকে আসাদ ০৫ হাজার টাকার বিনিময়ে একজনকে ভোগ করার প্রস্তাবও দিয়েছেন, যার নিজের স্টেটমেন্ট আমার কাছে প্রমাণ হিসেবে আছে।
আসাদ বক্সিং এরেনায় বক্সিং ট্রেনিং, ইভেন্ট আয়োজন ও আসাদুজ্জামানের অস্থায়ী অফিসের পাশাপাশি আরেকটি বিশেষ কাহিনি ঘটে প্রতিনিয়ত। বিদেশ থেকে আগত অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য ও দৈহিক চাহিদা মেটানোর জন্য অর্থের বিনিময়ে নিজ প্রতিষ্টানের নারী বক্সারদের ডেকে নেন আসাদ। তাছাড়া স্থানীয় এক প্রভাশালি নেতার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আফতাবনগরে ওই ভবনে জমে উঠেছে জমজমাট পতিতাবৃত্তি।
এতোসব অভিযোগ কেবলই পর্দার আড়ালে; তবে প্রকাশ্যে যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রয়েছে তা প্রশাসনের গাফিলতিতে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
১০/০৫/২০২৫ তারিখে নারায়গঞ্জের ফতুল্লা চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আসাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে মামলা করেন ইরফান পাঠান নামের এক পেশাদার বক্সার। মামলার ধরন ৩৮৫/৪২৭/৫০৬ (।।) দন্ড বিধি। এডভোকেট রুকন উদ্দিন সাক্ষরিত মামলার নথি ও প্রমান আমার হাতে আছে।
উক্ত মামলায় অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, তিনি আসাদ বক্সিং এরেনায় ট্রেনিং করেন এবং একজন পেশাদার বক্সার। তাকে ভিন্ন কোথাও খেলার অনুমতি না দিয়ে বরং খেলতে চাইলে ১০ লক্ষ টাকা চাঁদা পরিশোধ করতে হবে দাবি করেন আসাদ।
উল্লেখ্য, পেশাদার বক্সারদের টার্গেট করে বিভিন্ন লোভ দেখিয়ে আসাদ তার প্রতিষ্টানের সাথে চুক্তিবদ্ধ করে ফেলেন ১০ বছরের জন্য। এই ১০ বছরে অন্য কোথাও খেলতে পারবেনা এমনকি কোনোপ্রকার অর্থকড়ি চাইতেও পারবেনা এমন শর্তাদি আছে, যা না বুঝেই অনেকেই চুক্তিবদ্ধ হয়ে বিশাল এক ফাঁদে পড়েন।
অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে আমার সাথে কথা হয় এক পেশাদার বক্সারের যিনি আসাদের প্রতিষ্টানে ট্রেনিং করেছিলেন কিন্তু চুক্তিবদ্ধ হন নি। তাকে একবার ভারতে খেলতে পাঠালে, খেলায় মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন তিনি। চোখের কর্ণিয়া অপারেশন বাবদ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হলেও আসাদ তাকে খেলার পারফরম্যান্স মানি বাবদ মাত্র ০৫ (পাঁচ) হাজার টাকা তুলে দেন।
অনুসন্ধানে আরো উঠে আসে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বক্সারের তথ্য; যিনি কেরানিগঞ্জের বাসিন্দা- আসাদের প্রতিষ্টানের হয়ে খেলার সময় হাতে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন। হাতের কব্জিতে ফ্রেকচার হওয়ার পর অপারেশন করাতেও হয়। কিন্তু এর দায়ভার আসাদ নেননি এবং কোনো অর্থভারও নেন নি। ঘটনাটি জানাজানি হলে তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর স্ত্রী পাশে দাঁড়ান এবং অস্ত্রোপচারের অর্থ পরিশোধ করেন।
আফতাবনগরে গড়ে তোলা বক্সিং ট্রেনিং সেন্টার থেকে যৌন নিপীড়নের ও অনৈতিক কার্যকলাপের পাশাপাশি একটি অপরাধমূলক কাজও করে আসছেন আসাদ।
২০২৩ সালের এক সন্ধ্যায় সেখানে ৪ জন মানুষকে নিয়ে আসেন আসাদ। ট্রেনারকে নির্দেশ দেন তাদেরকে যেন টুকটাক জ্ঞান দেয়া হয় বক্সিং সম্পর্কে। কিন্তু যারা এসেছেন, তাদেরকে গ্রাম থেকে উঠে আসা মধ্যবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষ মনে হয়েছে ট্রেনারের। তবু তাদেরকে প্রায় আড়াই মাস ট্রেনিং দেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের মধ্য ৩ জনকে মেক্সিকোতে আয়োজিত একটি বক্সিং টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলের কোচ, সহকারি ও ফিজিও পরিচয় দিয়ে পাচার করে দেয়া হয়। তারা আর কখনোই বাংলাদেশে ফেরত আসেন নি।
এবং এটাই আসাদের একমাত্র মানব পাচারের উদাহরণ নয়।
২০২০ সাল থেকে বিভিন্ন দেশ থেকে বক্সারদের জন্য ইনভাইটেশন দেখিয়ে এসে বাংলাদেশ ক্রীড়া পরিষদের অনুমোদন নিয়ে সহজেই ভিসা পেয়ে যান আসাদ। এভাবে গত ০৫ বছরে অন্তত ২০ জনকে দেশ থেকে পাচার করেছেন তিনি। প্রত্যেকের কাছ থেকে অন্তত ২৫-৩০ লক্ষ টাকা করে নিয়েছেন আসাদ।
আমার কনসুলেট সূত্র বলছে, ইতালিতে মানবপাচারের সময় ২ জনকে ফিরিয়ে দেয়ার পর ইতালির বাংলাদেশ কনসুলেট তাকে ডেকে পাঠায় এবং তাকে ইতালি ভ্রমনে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছে।
আসাদের মানব পাচার নেটওয়ার্কের সাথে এক সেনা কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার দাবি উঠেছে। উল্লেখ্য, আসাদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে চলে গেলেও এখনো পেনশন ভাতা ও বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা পেয়ে আসছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি আসাদের অসংখ্য অনুষ্টানে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে দেখা গেছে।
এই বিষয়টি আরোও নরমালাইজ করতে AF visa consultancy নামে একটি প্রতিষ্টানও খুলেন আসাদ। যেখান থেকে মানব পাচারের মতো অপরাধ তিনি দিনদুপুরেই করে আসছেন।
পতিত সৈরাচার সরকারের এহেন কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গ নাই, যাদেরকে আসাদ চিনতেন না এবং তাদেরকে দিয়ে বিভিন্ন ফায়দা লুটেছেন।
২০২৪ এর নির্বাচনে চিত্রনায়ক ফেরদৌসকে তার ধানমন্ডির অফিসে নিয়ে আসেন এবং সবার কাছে ফেরদৌসের হয়ে ভোট চান। ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামের সাথে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছিলো অনৈতিক সব কার্যকলাপের হোতা হিসেবে। সুহেল তাজ আসাদকে পরিচয় করিয়ে দেন সাবেক সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রী, আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী আসাদুজ্জামানকে বিদেশে টাকা পাচারের এক বিশ্বস্ত রাস্তা হিসেবে খুঁজে নেন তাজ- কাদের। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আসাদ নিজের গাড়িতে করে মাত্র দুজন মানুষকে সাময়িক সময়ের জন্য তার ভাড়া নেয়া ফ্ল্যাটে রাখেন। আর তারা হচ্ছেন ওবায়দুল কাদের ও সাদ্দাম হোসেন। গাজীপুর ০৫ আসনের সাবেক সাংসদ মেহের আফরোজ চুমকি’র সাথে সখ্যতার প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন অবৈধ কাজেও বাঁধা পান নিন আসাদ।
আসাদুজ্জামানের অপরাধের পাহাড় ভিসুভিয়াস পর্বতের চেয়েও বড়, এর ডালপালা তারচেয়েও বেশি বিস্তৃত। আমার অনুসন্ধানে এমন কিছু তথ্য প্রমানই বেরিয়ে এসেছে।
– আসাদুজ্জামান দেশি খেলোয়াড়দের ঠিকমতো পারিশ্রমিক পরিশোধ করেন না।
– অতিথি হিসেবে নিয়ে আসা বিদেশি খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফিও পরিশোধ করেন না।
– বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজনের নামে স্পন্সরদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে ইভেন্ট সম্পন্ন করেন না।
– নেপাল, ফিলিপাইন, ভারতের অন্তত ০৬ জন বক্সার তাদের পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
– তাদের মধ্যে আছেন কলকাতার বক্সার নাসিম ও দিল্লির আজহার আলী।
– দেশের এক বক্সিং সংগঠক আসাদের কাছে ৩০ লক্ষ টাকা বাকি পান, বুঝে পেয়েছেন মাত্র আড়াই লক্ষ টাকা।
– ২ জন পেশাদার বক্সার তাদের বছরের পর বছর জমানো পারফরম্যান্স ফি এখনো বুঝে পান নি।
এগুলো তো কেবল শুরু;
নিজেকে WBC (বিশ্ব বক্সিং কাউন্সিল) এর কমিশনার হিসেবে পরিচয় দেন আসাদ; আমার অনুসন্ধান বলছে এই ধরণের কোনো পদবী-ই নেই wbc তে।
চায়না, কলম্বিয়া, মেক্সিকো এবং ফিলিপাইনে বিভিন্ন বক্সিং প্রতিষ্ঠানের সাথে তার এফিলিয়েশনের কথা বললেও, আমার অনুসন্ধানে এমন কোনো তথ্য পাই নি। তাছাড়া কলম্বিয়ার ইউনিভার্সাল বক্সিং কাউন্সিলে ওয়ার্ল্ড সেক্রেটারি নামে কোনো পোস্টই নেই; সবই ভুয়া নাম এবং পদবি ব্যবহার করে আসছেন আসাদ।
বক্সারদের জন্য আনা ইনভাইটেশন ব্যবহার করে বিদেশে মানব পাচার ও প্রশিক্ষণ নিতে আসা বক্সারদের সাথে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট, পেশাদার বক্সারদের বকেয়া ভাতা পরিশোধ, দেশি বিদেশি খেলোয়াড় ও আয়োজকদের অর্থ কেলেঙ্কারি, বিদেশের ব্যাংকে ঋণখেলাপী, দেশের আদলতে চাঁদাবাজির মামলা, স্ত্রী সন্তানদের সাথে কোনোপ্রকার যোগাযোগ না করা ও তাদের জীবনকে বিপন্ন করে তোলা ক্ষমতালোভী, চরিত্রহীন লম্পট, আন্তর্জাতিক বাটপারকে অতিদ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় নিয়ে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে।
বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।
এনাটমি অফ আ ক্রিমিনাল মাইন্ড : মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান | আহমদ আতিকুজ্জামান।
