BUILT NOT BY MERIT

ভদ্রমহিলা পেশায় একজন প্রকৌশলী। অফিস করেন
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি ভবনে। অবশ্য প্রকৌশলী ছাপিয়ে তার আরোও একটি পেশা আছে। তিনি কাজ করেন ফুটবল নিয়ে। খোলাসা করে বললে, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে! কিছুটা ছাগল দিয়ে হাল চাষের মতো ব্যাপার আরকি!

ব্যাপারটা শুনতে অদ্ভুত লাগলেও দেশের ফুটবলের শীর্ষ প্রতিষ্টানে ভদ্রমহিলা কাজ করেন তাও যেন-তেন কোনো পদে নয়। বাফুফে সহ-সভাপতি ফাহাদ করিম টিভি সাক্ষাৎকারে কিংবা সাংবাদিকদের পাল্লায় পড়ে কোনো কিছু তার বিপক্ষে গেলেই যেদিকে অভিযোগের তীরটা ছুড়ে মারেন, সেই পদে…

জ্বি, ঠিকই ধরেছেন। বাফুফের ট্যাকনিক্যাল টিমের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য প্রকৌশলী ফিরোজা করিম নেলীর কথাই বলছিলাম।

কিভাবে একজন প্রকৌশলী অত্যন্ত কৌশলে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে ঢুকলেন, এবং কোনো প্রকার খেলাধূলার রেকর্ড না থাকা স্বত্ত্বেও নারীদের জন্য বিশেষায়িত ফুটবল সংস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ বছরের পর বছর দখল করে রেখেছেন তা সবার সামনে তুলে ধরার প্রয়াশ এই লেখাটি।

তবে গল্পের শুরুটা হোক পালের হাওয়ায় ঘোর লাগা এক সময়ের।

বাংলাদেশে টেবিল টেনিস ততোটাও জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। ‘৭৪ সালের এক বিকেল। টানটান উত্তেজনায় মোড়ানো পুরো একটা দিন। টেবিল টেনিস জাতীয় চ্যাম্পিয়নশীপের লড়াইটা জড়ে উঠেছে দারুণ। টেবিলের দুই’পাশের দুজনের বয়সের ব্যবধান প্রায় ৮ বছরের। বিষ্ময়কর ব্যাপার, জাতীয় পর্যায়ে আয়োজিত এই খেলার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছেন আপন দুই বোন! বড় বোন মুনিরা রহমান হেলেনের অভিজ্ঞতার কাছে সেদিন হেরে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন ছোটবোন জোবেরা রহমান লিনু; আর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এই হারের বদলা তিনি নিবেন-ই!

বছর দুয়েক না ঘুরতেই সে কথার প্রমাণ পাওয়া গেলো। মাত্র ১২ বছরে জাতীয় শিরোপা জিতে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন লিনু। শুরু হলো তার এক অসীম দূরের যাত্রা; যে যাত্রা গিয়ে থামলো ২৫ বছর পর! দু’যুগের বেশি সময়ে শুধু ১৬ বার জাতীয়ভাবে শিরোপাই জিতেন নি, গড়েছেন এক অনন্য ইতিহাস। গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুকে লিখিয়েছেন নাম।

জোবেরা লিনুকে টেবিল টেনিসে ব্যস্ত রেখে ঘোর লাগা সময়ে দৌঁড়ে আসা যাক জাতীয় স্টেডিয়ামের ট্র‍্যাকে। যেখানে ‘৮৭ থেকে ‘৯৬ পর্যন্ত ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ১০ বার দ্রুততম মানবীর স্বীকৃতি পাওয়া ফিরোজা খাতুনের পদচিহ্ন আছে। গিনেজ বুকে নাম না লেখালেও, দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা পুরষ্কার পেয়েছেন ফিরোজা।

টেনিসের লিনু আর দৌড়বিদ ফিরোজা- দুজনেই উঠে এসেছেন প্রান্তিক জীবন থেকে। তাদের সাথে শহুরে পরিবেশে বেড়ে ওঠা ও উচ্চশিক্ষায় দীক্ষিত হওয়া
প্রকৌশলী ফিরোজা নেলীর BUILT NOT BY MERIT গল্পের কোনোই সম্পর্ক নেই।

লিনু ও ফিরোজা দুজনেই দেশসেরা এথলেট হয়েছেন নিজেদের যোগ্যতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে। তাদের ক্যারিয়ার শুরুর আগে থেকেই বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। নারীদের ক্রীড়ামঞ্চে স্বীকৃতি এনে দিতে যাদের পথচলা শুরু হয়েছিলো। নাম ‘নারী ক্রীড়া সংস্থা।’ আদতে এই সংস্থার কাজ হচ্ছে ‘কিছুই না করা।’

এদিকে প্রকৌশলী ফিরোজা নেলী দেশসেরা এথলেট হওয়া তো দূর কি বাথ, কখনো খেলাধূলার সাথেই সম্পৃক্ত ছিলেন না! প্রশ্ন উঠতে পারে- লিনু- ফিরোজা ও নারী ক্রীড়া সংস্থার সাথে প্রকৌশলী ফিরোজা নেলীর কি সম্পর্ক? খেলাটা আসলে এখানেই…

তবে তার আগে জেনে নিই, ফুটবলের সাথে কোনোভাবেই জড়িত না থেকেও একজন প্রকৌশলী কিভাবে বাফুফের গুরুত্বপূর্ণ একটা পদে আসীন হলেন।

২০০৯ সাল।
কাজী সালাউদ্দিন সবেই বাফুফে সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে বসেছেন। বাফুফে ভবনে বিভিন্ন ছোটখাটো দায়িত্বে তার কাছের মানুষজনকে বসাচ্ছেন। নারী ক্রীড়া সংস্থায় ইতিমধ্যেই নির্বাচিত সেক্রেটারি হিসেবে আছেন মাহফুজা কিরণ। যুবলীগের এই নেত্রীকে ২০০৩ সালে নারী ক্রীড়া সংস্থায় নিয়ে এসেছিলেন সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু। তারপর কাজী সালাউদ্দিনের আমলে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকারের হস্তক্ষেপে ও ক্ষমতাবলে দেশের ফুটবলের নারী নেতৃত্বের চালিকার আসনে চলে আসেন কিরণ। তবে হঠ্যাৎ-ই ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর নারী ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচিত কমিটি ভেঙ্গে দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনসিসি)। আর কিরণকে অপসারণ করা হয় সেক্রেটারির দায়িত্ব থেকে।

২০১২ সালে গঠিত সে অ্যাডহক কমিটিতে সভাপতি করা হয় আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য মাহবুব আরা গিনিকে। আর সাধারণ সম্পাদক হামিদা বেগম। ৩১ সদস্যের সেই অ্যাডহক কমিটির ৩য় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখা যায় ‘ফিরোজা করিম নেলী’র নাম; যাকে এর আগে কেউ কখনোই ক্রীড়া পরিষদ কিংবা খেলাধূলার সাথে জড়িত থাকতে দেখেন নি।

সেই কমিটিতে ফিরোজা নেলীর নাম দেখে যারা বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলেছিলেন, তাদের জন্য আরোও কিছু চমক ছিলো। এই যেমন আজীবনের জন্য বহিষ্কৃত হওয়া সদস্যকে কমিটিতে রাখা ও মৃ-ত ব্যক্তিকেও কমিটির উপরের সারিতে স্থান দেয়া! ঐ কমিটিতে দেলোয়ারা বেগমের নাম ছিলো ১৫ নাম্বারে, যিনি সে বছরের ২৫ জানুয়ারি পরলোকগমন করেছিলেন!

এনসিসির নীতিমালার ১৩ অনুচ্ছেদে অনধিক সাত সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচনকালীন একটি অন্তর্বর্তী কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ৩১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি করে। ব্যাপারটি নিয়ে আদালতের আশ্রয় নেন বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক কামরুন নাহার ডানা। আদালত তার রিটের প্রেক্ষিতে ৪ সপ্তাহের জন্য কমিটি’টি স্থগিত করেছিলেন।

২০১৮ সাল থেকে অসুস্থ থাকায় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হামিদা’র বদলে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নারী ক্রীড়া সংস্থায় নিজের জায়গাটুকু পাকাপোক্ত করেন ফিরোজা নেলী। ২২’ সালে হামিদা মারা গেলে, তিনি দায়িত্ব পান ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের। এবং ২০২৫ এর আগস্ট পর্যন্ত সেই পদেই বসে ছিলেন।

৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের সাথে সাথে দেশের সকল ফেডারেশনে পরিবর্তন সহজেই অনুমেয় ছিলো; এবং তাই হলো। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ভেঙ্গে যায় দেশের অন্তত ৫০ টি ফেডারেশন কমিটি। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও, নারী ক্রীড়া সংস্থার কমিটি বিলুপ্ত না করে আবারোও নতুন একটি অ্যাডহক কমিটি দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনিসিসি)! এবং সেই ক্রীড়া পরিষদের আবারোও দেখা যায় ফিরোজা নেলীকে; এবার ভারপ্রাপ্ত নয়- বরং ‘ভারসহ’ পুরোপুরি সাধারণ সম্পাদকের পদে! এদিকে সভাপতি করা হয়েছে সারাওয়াত সিরাজ শুক্লা’কে, যিনি পেশায় একজন ব্যারিস্টার! এনসিসির নির্বাহী পরিচালক কাজী নজরুল ইসলাম সাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে সারওয়াত শুক্লা একজন সিনিয়র আইনজীবি ও ক্রীড়ানুরাগী!

এই কমিটি ঘোষণার ঠিক পরদিন রাজধানীর মোহামেডান স্পোর্টস কমপ্লেক্সে এক জরুরি প্রেস কনফারেন্স করেন বিদায়ী কমিটি ও দেশের সাবেক ক্রীড়াবিদের একটি দল। তাদের কিছু ঘোরতর অভিযোগ ছিলো সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে; যেমন-

  • সরওয়ার শুক্লা ও ফিরোজা নেলী দুজনেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছেন। ফিরোজা গত ৮ বছর থেকেই ছিলেন, এবার শুক্লাও এই প্রসেসে সংস্থায় এলেন।
  • সভাপতি ও সেক্রেটারি দুজনেই কখনোও খেলাধূলার সাথে জড়িত ছিলেন না। তাদের কোনো অর্জন ও যোগ্যতা নেই।
  • নারী ক্রীড়া সংস্থা পরিচালনার জন্য দেশে অসংখ্য ক্রীড়াবিদ আছেন, যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছেন দেশের জন্য; তাদের অবহেলা ও অগ্রাহ্য করে শুক্লা-নেলীকে আসনে বসানো হয়েছে।
  • ফিরোজা নেলী খেলোয়াড়সুলভ ও খেলোয়াড়বান্ধব তো নন-ই, বরং বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদকের সাথেও প্রচন্ড খারাপ ব্যবহার করতেন!
  • একই পদে দুই মেয়াদের বেশি কেউ থাকতে পারবেনা, অথচ নেলী ২ টি ভিন্ন কমিটিতে একই পদে ৮ বছর ধরে আছেন!

আমার ব্যক্তিগত অনুসন্ধান বলছে, ৩১ জনের ওই কমিটির ৬ জন ছিলেন আওয়ামীলীগের সরাসরি নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ, ৩ জন মারা গেছেন! সভাপতি-সেক্রেটারিও আওয়ামীলীগের আমলে থাকা কাজী সালাউদ্দিনের আস্থাভাজনেরা তৈরি করেছে! ৫ আগস্টে পর থেকে আওয়ামীলীগের নিয়োগপ্রাপ্তরা আর সংস্থায় আসেন না; তাদের ছাড়াই হয়েছে ৪ টি গুরুত্বপূর্ণ কোরাম। অন্তত ১০ জন না হলে কোরাম হয় না, অথচ সভায় উপস্থিত থাকেন মাত্র ৬-৭ জন!

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, এই কমিটি দেয়ার আগে এনসিসি একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছিলো জোবায়দুর রহমানের নেতৃত্বে; তিনি সে তালিকা পাঠিয়েছিলেন তার সাথে কমিটির বিন্দুমাত্র মিলই নেই!

অর্থাৎ, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ৮ বছর দলীয় মানুষকে দিয়েই বাংলাদেশ নারী ক্রীড়া সংস্থা পরিচালনা করে আসছে এবং অ-যোগ্য দুই প্রার্থীকে প্রধান দুটি আসনে বসিয়ে রেখেছে। পাশাপাশি, খোদ সংস্থারই নীতিমালা ভঙ্গ করে চালিয়ে নেয়া হচ্ছে কমিটি! আর পিছনে পুরোটাই কলকাঠি নেড়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) সাজিয়া আফরিন, সহকারী পরিচালক শাহরিয়া সুলতানা (ক্রীড়া) ও মো: দৌলতুজ্জামান খাঁন, এনডিসি (নির্বাহী পরিচালক/যুগ্ম সচিব) গং!

এ তো গেলো কেবল নারী ক্রীড়া সংস্থায় ফিরোজা নেলীকে পদ পাইয়ে দেয়া, পদে ধরে রাখা এবং আওয়ামীলীগের কমিটি বাস্তবায়নের চিত্র। এবার ফিরোজা করিম নেলীর ‘আসল’ পেশা প্রকৌশলে ফিরে তাকাই।

ফিরোজা নেলী পড়াশোনা করেছেন

বাংলাদেশের দূর্নীতিগ্রস্ত অধিদপ্তরগুলোর একটি হচ্ছে এলজিইডি বা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। এখানে চাকরি পেতে হলে থাকতে হয় গাঢ় রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রচুর অর্থবিত্ত। বাকিটা করবে খোদ মন্ত্রনালয়-ই। বিসিএস এর মতো চাকরির পরীক্ষা নেই, প্রজ্ঞাপনেই মিলে চাকরি।

জানা গেছে, কৃষিতে বিএসসি পাস করে ২০১১ সালে মুহাম্মদ নুরুন্নবী যোগ দেন এলজিইডিতে (জন্ম-১.১.১৯৬৮)। তিনি চাকরি পান সংস্থার সহকারী প্রকৌশলী (পুর) হিসেবে। একইভাবে আব্দুল মালেক (জন্ম-১৮.৭.১৯৬৩), শিখা ব্যানার্জী (জন্ম-১.১.১৯৭০), আল আমিন সরকার (জন্ম-২০.১০.১৯৭০), কেএম রেজাউল করিম (জন্ম-১০.১.১৯৭৩) সহকারী প্রকৌশলী হয়েছেন পুরকৌশলে পড়াশোনা না করে।

২০০৯ অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদের জন্য পুরকৌশলে বিএসসি ডিগ্রি দরকার। কিন্তু ২০১১ সালের ২৫ আগস্টের প্রজ্ঞাপনে নিয়মিত হওয়া ১০৯ জনের মধ্যে এই ৫ জনের সেই শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না।

ফিরোজা করিম নেলীর ব্যাপারটা আরোও অদ্ভুত। স্নাতক পাশ করেই সরকারি চাকরিতে ঢুকে গেছেন তিনি। তাও এলজিইডি মন্ত্রনায়লয়ে! এবং এক সময় তাকে পদোন্নতি পেতেও দেখা যাবে যথার্থ যোগ্যতা ছাড়াই! তাকে এই চাকরি দেয়া থেকে পরবর্তী ১৫ বছর একাই আগলে রেখেছেন ফিরোজ আলম তালুকদার নামের এক ভদ্রলোক!

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পের ভয়াবহ দূর্নীতির রিপোর্টগুলো ফাঁস হতে থাকলে দেখা যায়, এইসব প্রকল্পের মূল হোতা আর কেউ নন- প্রকৌশলী ফিরোজ আলম তালুকদার! উপ-সহকারী প্রকৌশলী শেখ রাজীবকে কেন্দ্র করে মন্ত্রনালয়ে গড়ে উঠে এক লুটেরা চক্র। শেখ রাজীবের স্ত্রী পুলিশের এসআই পদমর্যাদার, গণভবনে শেখ হাসিনার দায়িত্বে ছিলেন। আওয়ামী সরকারের পতনের পর ফিরোজ আলম তালুকদারকে প্রকাশ্যে তারই অফিসে লাঞ্চিত করে জামাকাপড় ছিড়ে ফেলে কর্মকর্তারা এবং পরে বদলি করে এলজিইডির ভবনে তাকে নিয়ে আসা হয়েছে। (২০২৫, ৬ নভেম্বর)

ফিরোজা করিম নেলী একজন পুর প্রকৌশলবীদ হিসেবে এতোদিন কাজ করছিলেন এলজিইডিতে; সরকার পরিবর্তনের পরপরই প্রধান প্রকৌশলী আলী আখতার হোসেন অবসরে যাওয়ার আগে আগেই ১১২ জনকে চলতি দায়িত্ব থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেয়ার উদ্যোগ নেন। এর মধ্য থেকে ৬ জনকে জ্যোষ্ঠতার মানদন্ডে পদোন্নতি করার কথা থাকলেও ছিলো না ফিরোজা করিম নেলীর নাম। তবুও তিনি রহস্যজনকভাবে পূর্ণকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।

এলজিইডি প্রকাশিত জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকা ২০২৪ (ক্রমিক নং ৬২৭)-এ দেখা যায়, ফিরোজা করিম নেলী ৪১ বছর (!) বয়সে ২০০৯ সালে পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে ২০১৩ সালে সরকারি চাকরিতে আদিষ্ট হয়েছেন। অথচ এই ৪ বছরে পুরকৌশল বিষয়ে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরে চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা তার নেই। যেখানে এলজিআরডি ফিডার পদের নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি সিভিল ইঞ্জিয়ারিং, সেখানে নেলী স্নাতক ডিগ্রী নিয়েই স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরে পূর্ণকালীন প্রকৌশলীর চাকরি পেয়ে গেছেন। আর এই চাকরি পেতে ও পদোন্নতি পেতে রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি ব্যবহার করে তদবির করার পাশাপাশি বিশাল অঙ্কের ঘুষও প্রদান করেছেন ফিরোজা করিম নেলী।

অর্থাৎ, কর্মজীবনের শুরু থেকেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন ফিরোজা নেলী। নারী ক্রীড়া সংস্থার জয়েন্ট সেক্রেটারি থাকা অবস্থায় নেলীকে সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোঃ জাহিদ আহসান রাসেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন মেহবাহ উদ্দিন। মেজবাহ যখন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের সচিব হিসেবে যোগ দেন, তখন থেকেই নেলী এক প্রকার অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেন। এবং তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

এবার তাকে দেখা যাক বাফুফের টেকনিক্যাল কমিটির গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য হিসেবে।

আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, ফিরোজা করিম নেলী বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বাফুফের টেকনিক্যাল কমিটির দায়িত্ব পাওয়ার আগে বাফুফের ভোটার কিংবা ডেলিগেট লিস্টেই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না! অর্থ্যাৎ, সম্পূর্ণই উড়ে উঠে জুড়ে বসা অবস্থা নেলীর..

জুলাইয়ের পর বাফুফের প্রেসিডেন্টের হিসেবে তাবিথ আউয়াল দায়িত্ব নেয়ার পর বড়সড় একটা পরিবর্তনের আশা করেছিলেন অনেকেই। অথচ দেখা গেলো সালাউদ্দিন আমলের প্রায় অনেক কর্মকর্তা কর্মচারীকেই নতুন বাফুফে কমিটিতে স্থান দেয়া হয়েছে।

শুধু স্থান দেয়াই নয়; বরং বিভিন্ন সাব-কমিটিতে রাখা হয়েছে বিতর্কিত অনেক সদস্যকেই। যাদের ফুটবলে সম্পৃক্ততা শূন্যের কোটায় কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়টাই বড়। এমনই এক চরিত্র ফিরোজা করিম নেলী। যাকে বর্তমান ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক পরিচয়ে যিনি একেবারেই নিয়মবহির্ভূত একটা কমিটিতে জায়গা দখল করে নিয়েছেন, তাকেই বিভিন্ন ব্যক্তিরা পদোন্নতি দিয়ে আজ বাফুফের টেকনিক্যাল কমিটি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। অথচ এই মানুষটার ফুটবলের সাথে বিন্দুমাত্রও জড়িত না। পালাবদলের এই সময়ে ফুটবল এগিয়ে যাওয়ার যে স্বপ্ন দেখছে বাংলাদের ফুটবল ভক্তরা- সে স্বপ্নে জলাঞ্জলি দিতে এরকম জ্ঞানহীন, অথর্ব ও অযোগ্য মানুষকে টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য হিসেবে দিনকেদিন পার করছে বাফুফে!

আর কোনো ইস্যু সামনে আসলেই সহ-সভাপতি তার নিজের উপর দায় না নিয়ে সরাসরি ছেড়ে দেন টেকনিক্যাল কমিটির উপর। যেন দেখার কেউ নেই, বলার কেউ নেই।

বাংলাদেশ ফুটবল দীর্ঘজীবী হোক।

BUILT NOT BY MERIT | আহমদ আতিকুজ্জামান।

জনপ্রিয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *