জাসদের রাজনীতি, সংগ্রাম, ত্যাগ, ও ভাঙন (১ম পর্ব)

সময়টা ছিল ১৯৭২ সালের ২০শে মে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র ছাত্র সংসদ, ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্রলীগের অন্দরে দুটি ভিন্ন মতাদর্শের গ্রুপের মধ্যে আলাদা প্যানেল তৈরি হয়। ভোটের তারিখ ছিল ৩ জুন। বঙ্গবন্ধুর স্নেহের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির দল থেকে শেখ শহিদুল ইসলামকে ভিপি এবং মনিরুল হক চৌধুরীকে জিএস পদে লড়ার জন্য মনোনীত করা হলো।

অন্যদিকে, প্রবীণ ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খানের অনুসারীরা জিনাত আলীকে ভিপি ও মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশকে জিএস পদের জন্য দাঁড় করালেন। ছাত্রলীগের দুটি আলাদা প্যানেল হওয়ায় ভোটের ময়দানে তৈরি হলো বিভেদ। ফলস্বরূপ, ছাত্র ইউনিয়নের মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ভিপি ও মাহবুব জামান জিএস পদে বিজয় ছিনিয়ে নিলেন। এই ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগে শুরু হলো বহিষ্কারের পালা। সিরাজুল আলম খানের সমর্থকেরা নূরে আলম সিদ্দিকীকে দল থেকে বের করে শরীফ নুরুল আম্বিয়াকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দিলেন। পাল্টা জবাবে শেখ মনির সমর্থকরাও শাজাহান সিরাজকে বহিষ্কার করে ইসমত কাদির গামাকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বানালেন। এই বিভাজন যেন শেষ পর্যন্ত ছাত্রলীগকে জাতীয় সম্মেলনের দিকে ঠেলে দিল।

১৯৭২ সালের ২১ থেকে ২৩শে জুলাই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের দিন স্থির করা হয়। সিরাজুল আলম খানের অনুসারীরা পল্টন ময়দানে সম্মেলনের আয়োজন করলেন, আর শেখ ফজলুল হক মনির মুজিববাদপন্থীরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের স্থান ঘোষণা করলেন। মজার ব্যাপার হলো, উভয় গ্রুপই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান অতিথি হিসেবে পাওয়ার আশা রেখে তাঁর নাম ঘোষণা করলেন। প্রত্যেকেরই বিশ্বাস ছিল, বঙ্গবন্ধু তাদের সম্মেলনে নিশ্চয়ই আসবেন। ২১শে জুলাই বঙ্গবন্ধু পল্টন ময়দানে না গিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুজিববাদীদের সম্মেলনে যোগ দিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তে সিরাজ গ্রুপের নেতা-কর্মীরা যেন আকাশ থেকে পড়লেন।

আসলে, সেদিনই যেন ছাত্রলীগ সম্পূর্ণভাবে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল। পল্টনের সেই সম্মেলনে কবি আল-মাহমুদও উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীর মুজিববাদকে ব্যঙ্গ করে একটি গান গেয়েছিলেন, যার একটি লাইন ছিল, “একটি টাকা চালের দাম, মুজিববাদের অপর নাম”। (সূত্র: দাসগুপ্ত, স্বপন, ২০২৫)

কে এই সিরাজুল আলম খান?

সিরাজুল আলম খান ছিলেন জাসদের সুপ্রিম লিডার। দলের ভেতরে সবাই তাঁকে ‘দাদাভাই’ নামেই ডাকতেন। তিনি ছিলেন ‘নিউক্লিয়াস’-এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৬২ সালে ‘হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন’-এর রিপোর্টের বিরুদ্ধে এবং পাকিস্তানে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন দীর্ঘ দিন ধরে চলেছিল।

এই আন্দোলন সিরাজুল আলম খানের মনে ‘স্বাধীনতার বীজ’ বুনে দিয়েছিল, যা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সেই আন্দোলনের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমদ ও আবুল কালাম আজাদ মিলে ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস’ নামে একটি বিপ্লবী সংগঠন তৈরি করেন, যা ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরু।

১৯৬৫ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা সিরাজুল আলম খান ছিলেন ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি।

১৯৭২ সালের ১ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক ও বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকায় জাসদ প্রতিষ্ঠার খবর ছাপা হয়। ছবি: ইত্তেফাক ও বাংলাদেশ অবজারভার থেকে সংগৃহীত

১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এক বিশাল জনসভা হয়। সেখানেই ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন। এই উদ্যোগের মূল পরিকল্পনা ছিল সিরাজুল আলম খানের।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)’ তৈরি হয়। এই বাহিনীর সদস্যরা পরবর্তীতে ‘মুজিব বাহিনী’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

মুক্ত স্বদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল ‘জাসদ’-এর উন্মোচন

১৯৭২ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস স্মরণে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের এক সমাবেশে আ স ম আব্দুর রব একটি নতুন দল প্রতিষ্ঠার আভাস দেন। (ইসলাম, নজরুল, ২০১৩)

১৯৭২ সালের ৩১শে অক্টোবর মেজর (অব.) এম এ জলিল এবং আ স ম আবদুর রবকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নামক একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই দলে ৭ জন সদস্যের সমন্বয়ে একটি আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।

পরের দিন, ১লা নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল – ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন’। পত্রিকাটির সংবাদে উল্লেখ করা হয়, ‘দেশে বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই দল সমাজিক বিপ্লব সাধনের চেষ্টা চালাবে। দলটি সমাজতান্ত্রিক নীতিসমূহের বাস্তবায়নকেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে।’

অন্যদিকে, জাসদের প্রধান মুখপাত্র গণকণ্ঠ পত্রিকার প্রথম পাতায় ১লা নভেম্বর এম এ জলিল ও আ স ম রবের হাস্যোজ্জ্বল ছবি দিয়ে প্রধান সংবাদ করা হয়। পত্রিকাটির শিরোনাম ছিল – ‘শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের সংগ্রামের অঙ্গীকারে উজ্জীবিত নতুন রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয় – ‘রক্তে রঞ্জিত বাংলার অগণিত মেহনতি মানুষের শোষণ, বঞ্চনা, আর হতাশার গ্লানি মুছে ফেলার বিপ্লবী শপথের মাধ্যমে জনগণের হৃদয় নিঃসৃত সমর্থন ও আশীর্বাদ নিয়ে বাংলার রাজনৈতিক আকাশে এক নতুন তারা উদিত হলো – এই নতুন রাজনৈতিক সংগঠনের নাম জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল।’

১৯৭২ সালের ২৩ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাসদের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ৫১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হয়। এতে এম এ জলিল সভাপতি, আ স ম রব সাধারণ সম্পাদক ও শাজাহান সিরাজ যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।

জাসদ গঠনের আগে তাজউদ্দীন আহমদকে নতুন দলে টানতে সিরাজুল আলম খান তাঁর পেছনে লেগেছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ ৩০ অক্টোবর সিরাজুল আলম খান ও আ স ম আব্দুর রবকে তাঁর বাসায় ‘চা–নাশতার দাওয়াত’ দেন । তারা শাজাহান সিরাজ, মোহাম্মদ শাহজাহান ও নূরে আলম জিকুকে সঙ্গে নিয়ে মিন্টো রোডে তাজউদ্দীন আহমদের বাসায় সারারাত আলোচনা করেন।

তাজউদ্দীনের সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজ উদ্দীন, মো. সিরাজুল ইসলাম, রহমত আলী ও রিয়াজুল হক। এক পর্যায়ে তাজউদ্দীন রীতিমতো ভেঙে পড়েন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, আওয়ামী লীগে তিনি যথেষ্ট কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। অথচ এই বৃত্তের বাইরে যাওয়ার মতো সাহস তাঁর ছিল না। তিনি বললেন, বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে তাঁর কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। তবে কথা দেন, ‘নতুন দল গড়তে সিরাজুল আলম খানদের তিনি যতদূর সম্ভব সহায়তা দেবেন। (আহমদ, মহিউদ্দিন, ২০১৪)

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ’নামটি কীভাবে এলো?

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সংক্ষেপে জাসদ। দলের নামকরণ, পরিকল্পনা ও রণকৌশল এককভাবে করেছেন দলটির তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খান। নামকরণ নির্ধারণ করে পত্রিকায় প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানো পর্যন্ত তিনি খুব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। যাতে এই নাম বেহাত হয়ে না যায়।

জাসদের রাজনীতির বিরোধিতাকারীরা সেই সময় বলতেন, জার্মানিতে হিটলারের ‘ন্যাশনাল স্যোশালিস্ট পার্টি’ থেকে উৎসাহিত হয়ে ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ নামটি নেওয়া হয়েছে।

তবে, বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়ার দাবি, ‘দেশ স্বাধীনের পরে কমিউনিস্ট পার্টি, সর্বহারা পার্টি, ন্যাপসহ বেশ কয়েকটি বামদল অ্যাকটিভ ছিল, যাদের আদর্শ ছিল কমিউনিজম। তারা ছিল সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। জাসদের উদ্যোক্তারা ভেবেছিলেন– দল গঠনের ক্ষেত্রে নতুনত্ব ও বৈচিত্র্যময় কিছু করতে হবে। তাই ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে ’বিশ্বাসী হয়ে দলের নাম দিয়েছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল।’

জাসদের প্রথম হঠকারী সিদ্ধান্ত

১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করে জাসদ। ওই দিন ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫৪ তম জন্মবার্ষিকী। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে ১৭ মার্চ পল্টনে জনসভা করে জাসদ। সভাশেষে দলের সভাপতি এম এ জলিল ও সাধারণ সম্পাদক আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে নেতা–কর্মীরা মিছিল নিয়ে মনসুর আলীর মিন্টো রোডের সরকারি বাসা ঘেরাও করেন। ওই সময় মন্ত্রী কেরানীগঞ্জে ছিলেন। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে মিছিলকারীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করে স্লোগান দিতে থাকেন। তাঁরা বাড়ির লোহার গেটে আগুন ধরানোর চেষ্টা করেন ও ভেতরে ইটপাটকেলও ছোড়েন।

পুলিশও বাসার ভেতর থেকে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে মিছিলকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়; শুরু হয় সংঘর্ষ। এ সময় ঘটনাস্থলে আসেন রক্ষীবাহিনীর সদস্যরাও। এক পর্যায়ে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পুলিশকে সহায়তা দিতে থাকে রক্ষীবাহিনী। তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি করে। মেজর জলিল ও আ স ম রব, শাজাহান সিরাজ, মমতাজ বেগমসহ জাসদের অনেক নেতা–কর্মীকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির সামনের রাস্তায় আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। ওই সময় পুলিশ জাসদের প্রায় অর্ধশত নেতা–কর্মীকে আটকও করে। সে সময়ই গুলিতে নিহত হন ৬ জন। (১৮ মার্চ ১৯৭৪, দৈনিক ইত্তেফাক)  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

  • Hello world!

    Welcome to WordPress. This is your first post. Edit or delete it, then start writing!

    Read More

  • একুশের মেলা, না-আসা বই, আর লেখকের নীরব দীর্ঘশ্বাস একুশ কোনো সাধারণ তারিখ নয়। একুশ মানে ভাষা, আত্মপরিচয়, মাথা নত না…

    Read More

  • কর্ণেল তাহের ও তার পৃথিবী সমান স্বপ্ন!

    কর্নেল তাহের বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ব্ল্যাক বক্স’! শাহাদুজ্জামান তাঁর ‘ক্রাচের কর্নেল’ উপন্যাসে তাঁকে বলেছেন এক আশ্চর্য নামে। বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ব্ল্যাক বক্স’।…

    Read More