জহির রায়হান ও ‘গুম’ অধ্যায়ের সূচনা।

জহির রায়হান তথাকথিত স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম এবং সহজাত পরিহাস দেশ যখন তার চাওয়ামত স্বাধীন হলো তখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ‘গুম’ হওয়া ব্যক্তি হয়ে গেলেন তিনি স্বয়ং।

অর্থাৎ জহির রায়হানকে দিয়েই স্বাধীন(!) বাংলাদেশে গুমের মতো একটি জঘন্য রাজনৈতিক চক্রান্তের সফল অভিষেক হয়।

১৯৭২ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ বছর আমাদের বিশ্বাস করানো হয়েছিল কিংবদন্তী কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও চিত্রপরিচালক জহির রায়হানকে ‘গুম’ করে ফেলা হয়েছে রাজনৈতিক কারণে।

শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার ১৫ দিন পর ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ঘোষণা দেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের পেছনে নীলনকশা উদ্ঘাটনসহ মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক গোপন ঘটনার নথিপত্র, প্রামাণ্য দলিল তার কাছে আছে, যা প্রকাশ করলে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রীসভায় ঠাঁই নেয়া অনেক নেতার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে পড়বে। আগামী ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এই প্রেসক্লাবে ফিল্ম শো প্রমাণ করে দেবে কার কি চরিত্র ছিল।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জহির রায়হান আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছান। নিজেকে যুক্ত করেন মুক্তিযুদ্ধের প্রচার কাজ সংগঠিত করার কাজে নিজেকে যুক্ত করেন এবং পাকিস্থানের গণহত্যা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য ‘’স্টপ জেনোসাইড” নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যুদ্ধে শরণার্থী শিবিরে মানুষের দুর্দশার চিত্র, কলকাতায় পালিয়ে যাওয়া বড় বড় নেতাদের আরাম আয়েশের চিত্র তুলতে গিয়ে জহির রায়হান মুজিবনগর সরকারের রোষানলে পড়েছিলেন। সাধারন মানুষদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করার অমানুষিক পরিশ্রমের অনেক চিত্র তিনি জীবন বাজি রেখে ধারন করেছিলেন । ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার সময় ও মুক্তির দেয়ার সময় কলকাতায় আওয়ামীলীগ

নেতারা বারবার জহির রায়হানকে বাধাগ্রস্থ করেছিলেন যে সম্পর্কে জহিরের চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবির বলেন – “তিনি (জহির রায়হান) যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্যই ঢাকা ছেড়ে আগরতলা এবং পরে কলকাতা চলে যান। কলকাতায় তিনি প্রচার কাজ সংগঠিত করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পতিত হন এবং তাঁকে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হতে হয়।

“স্টপ জেনোসাইড” ছবিটি নির্মাণের সময় আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁকে নানাভাবে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরে শুটিং করতে দেয় নি, এমন কি কোন কোন সেক্টরে তাঁর গমন পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল।

তাকে গুম করা হয়েছে এমন নাটক বহুদিন চললো। স্বয়ং শেখ মুজিব বললেন, জহিরকে গুম করা হয়নি। সে নিজেই বাড়ি থেকে হারিয়ে গেছে!

যুদ্ধের সময় দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়ানো একজন টগবগে মানুষ কিভাবে এতো সহজে হারিয়ে যায়?

জহির রায়হানের ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিদের অন্যতম একজন শহীদুল্লাহ কায়সারকে হন্য হয়ে খুঁজতে থাকেন রায়হান। কত জায়গায় ঘুরান, ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসী একজন মানুষ পীর ফকির, মাজারেও যান ভাইকে পাওয়ার আশায়। হঠ্যাৎ একদিন ফোন এলো মিরপুরে গেলে পাওয়া যাবে তাকে। জহির গেলেন সেখান। আর ফিরে আসলেন না!

তাকে সেদিনই খু/ন করে পানির ট্যাঙ্কে ফেলে রাখে একটা দল। যারা ভয়ে ছিলো জহিরের ক্যামেরায় না জানি কি ফুটে উঠে। সে ভয় থেকে জহিরকে হ/ত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশ।

৩০ জানুয়ারি। জহির রায়হান গুম দিবস।

জনপ্রিয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *