
একটা দেশের জনগনের মত প্রকাশের সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম সংবাদমাধ্যম। হালের বিবর্তনে কাগজের সংবাদপত্রের ব্যবহার দিনদিন কমে আসলেও জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি একটুও।
এখন ডিজিটাল যুগ। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ডিজিটাল নেটওয়ার্কভিত্তিক টিভি চ্যানেল ও লাইভ স্ট্রিমিংয়ের সর্বোচ্চ সুযোগটা ব্যবহার করছে বাংলাদেশ। তবে আশ্চর্যের বিষয় একসময় যে সংবাদ মাধ্যমগুলো পরিচিত ছিলো সরকারের সমালোচনা, পক্ষপাতহীন ও নিরপেক্ষ, আজ তারা সকলেই সরকারের পক্ষে নিরব অবস্থান নিয়েছে!
তবে সরকারের পক্ষে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের পিছনে তাদের অবস্থান কখনোই খোলাসা না করলেও তাদের কার্যক্রমে জনসাধারণ ভেতরের খবর ঠিকই জানে। মূলত, এটক্যো বা ‘এসোসিয়েশন অব টিভি চ্যানেলর ওউনার্স’ এটাকে পরিচালনা করে।
বাংলাদেশকে ২০১৮ সালে একনায়কতান্ত্রীক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষনা করেছে জার্মান ভিত্তিক সংগঠন বেরটেলসমান স্টিফটুং। এর পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে দেশের সংবাদমাধ্যম গুলো।
বাংলাদেশের প্রায় সকল টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রের মালিক সরাসরি সরকারি দলের কিংবা সরকারি দলের ছায়াতলে বেড়ে উঠে কেন এই প্রশ্নটার উত্তর কারো জানা নেই। লিস্টটা দেখলে আঁতকে উঠবেন।
দৈনিক ইত্তেফাকের মালিক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে নেমেছেন। দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের মালিক শিল্পপতি একে আজাদ (স্বতন্ত্র প্রার্থী) নির্বাচনে অংশগ্রহন করছেন। দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টেলিভিশনের মালিক সালমা ইসলাম জাতীয় পার্টি-জাপার হয়ে নির্বাচন করেছেন। ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির মালিক সালমান এফ রহমান নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামীলীগের হয়ে নির্বাচন করেছেন।
আরটিভির মালিক মোর্শেদ আলম নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন পত্রিকার মালিক কাজী নাবিল আহমেদ নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। দৈনিক সংবাদের আলতামাস কবীর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করেছেন। সময় টিভির এডভোকেট কামরুল ইসলাম নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। দৈনিক ভোরের কাগজের সাবের হোসেন চৌধুরী নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন।
কালবেলার মালিক নজরুল ইসলাম স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচন করেছেন। গাজী টিভি ও অনলাইন সারা বাংলার মালিক গোলাম দস্তগীর নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। মোহনা টেলিভিশনের মালিক কামাল আহমেদ মজুমদার নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। দৈনিক ও অনলাইন ঢাকা টাইমসের মালিক আনিফুর রহমান দোলন স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচন করেছেন।
এর বাইরে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকাধীন কালেরকন্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, নিউজ টোয়েন্টিফোর, ডেইলি সানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত নঈম নিজাম কুমিল্লা থেকে নৌকার দলীয় মনোনয়ন তুলেছিলেন। কিন্তু পাননি। এছাড়াও আরো কিছু মিডিয়া ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্নস্তরের নেতাদের মালিকাধীন।
মিডিয়ার পচন ধরেছে। সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ। সেই দর্পণ তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। শুধু মিডিয়া না। শিক্ষক সমাজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজও সুবিধাবাদিতার চরমে পৌঁছেছে। এমনিতেই দেশে নির্বাচন নেই তাই কাঙ্খিত পার্লামেন্ট নেই। তার উপর যদি সাংবাদিক এবং শিক্ষক সমাজ নষ্ট হয় এই দেশ থাকবে? অথচ এদের হওয়ার কথা শরীরের শ্বেত কণিকার মত সমাজ তথা রাষ্ট্রের শ্বেত কণিকা। একটা রোগ আছে না যার নাম অটো ইমিউন রোগ। বাংলাদেশ এখন সেই রোগে আক্রান্ত। শিক্ষিত মানুষ যদি নষ্ট হয় তখন আর কিছু বাকি থাকে না। অথচ এরাই দেশপ্রেমিক সাজে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বাহক সাজে। আসলে এদের কাছে দেশের চেয়ে নিজের লাভ বড়। এত দুর্নীর্তিবাজ, চোর, পাটপার, তোষামোদকারী, দূষিত শ্বেত কণিকার মানুষ দিয়ে এই দেশ কিভাবে ভালো থাকবে?
বাংলাদেশ এখন এমন একটি দেশ যেই দেশে না আছে সাংবাদিক, না আছে শিক্ষক, না আছে বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক। কেবলমাত্র এখনো শুদ্ধ আছে কৃষক।
যে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাই, তাদের মত প্রকাশ করার মতো প্লাটফর্ম নেই এবং যারা জনগনের পক্ষে বলার কথা- তারাও সরকারের তাবেদারিতে ব্যস্ত থাকলে- এদেশে মত প্রকাশ করবে কারা?

