একুশে বইমেলা- জমে থাকা ক্ষোভ

একুশের মেলা, না-আসা বই, আর লেখকের নীরব দীর্ঘশ্বাস

একুশ কোনো সাধারণ তারিখ নয়।

একুশ মানে ভাষা, আত্মপরিচয়, মাথা নত না করা এক জাতির ইতিহাস।

আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে জীবন্ত, সবচেয়ে আবেগঘন আয়োজন হলো অমর একুশে বইমেলা।

এই বইমেলার ইতিহাস খুব পুরোনো নয়, কিন্তু এর শিকড় গভীরে। ভাষা শহীদদের স্মরণে শুরু হওয়া এই আয়োজন ধীরে ধীরে বাঙালির সবচেয়ে আপন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখানে বই শুধু বিক্রি হয় না—এখানে আবেগ আদান-প্রদান হয়। লেখক পাঠকের মুখোমুখি দাঁড়ান, প্রকাশক নিজের সব ঝুঁকি নিয়ে স্বপ্ন সাজান, পাঠক খুঁজে ফেরেন নিজের মতো কোনো বাক্য।

একুশের বইমেলায় হাঁটলে একসময় মনে হতো—পুরো জাতি যেন একসঙ্গে পড়তে বসেছে।

আমি একজন লেখক।

গত বইমেলায় আমার লেখা অল রেডস প্রকাশিত হয়েছিল। নিজের বই হাতে নিয়ে স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার যে অনুভূতি—তা একধরনের নীরব আনন্দ। প্রকাশকের চোখে তখন ক্লান্তির ভাঁজ, তবু ভেতরে লুকিয়ে থাকা তৃপ্তি। কারণ একটি বই প্রকাশ মানে শুধু কাগজে অক্ষর ছাপা নয়—এটা বিশ্বাসের ফল।

প্রকাশক মানে হিসাবের মানুষ, আবার স্বপ্ন দেখার মানুষও।

তিনি জানেন ক্ষতির ঝুঁকি আছে, তবু লেখকের কথায় ভরসা রাখেন। এই ভরসার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে পুরো প্রকাশনা জগত।

২০২৬ সালের বইমেলা সেই ভরসার জায়গাটাতেই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক অস্থিরতা আর অর্থনৈতিক চাপে প্রকাশনা শিল্প আজ দুর্বল। অনেক প্রকাশকই চেয়েছিলেন—এই বছর বইমেলা না হোক, কিংবা অন্তত সময় পিছিয়ে দেওয়া হোক। প্রকাশ্যে এসেছে আপত্তি, এসেছে বাতিলের দাবিও।

তবু বইমেলা হচ্ছে।

কারণ একুশ একটি প্রতীক।

কারণ একুশকে থামানো মানে আবেগে আঘাত করা।

কারণ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—সব পরিস্থিতিতেই মেলা “হতেই হবে”।

কিন্তু উৎসব কি আদেশে হয়?

উৎসব কি ক্যালেন্ডারের জোরে টিকে থাকে?

এই জোর করে আয়োজিত হওয়া বইমেলার ভেতরে ঢুকলে এক ধরনের শূন্যতা অনুভব হয়। আলো আছে, স্টল আছে, ব্যানার আছে—কিন্তু প্রাণ নেই। পাঠকের চোখে আগ্রহ কম, লেখকের মুখে উৎসবের হাসি অনুপস্থিত, আর প্রকাশকের মনে চাপা উদ্বেগ।

কাগজের দাম বেড়েছে, ছাপার খরচ বেড়েছে, বিক্রি অনিশ্চিত।

তবু প্রকাশককে স্টল নিতে হচ্ছে, কারণ একুশ মানে “থাকা চাই”।

এই থাকা চাওয়াটাই আজ অনেকের জন্য সবচেয়ে বড় বোঝা।

এই প্রেক্ষাপটে আমার দ্বিতীয় বই নার্কোস প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। হয়নি।

এই না-হওয়াটা শুধু আমার ব্যক্তিগত হতাশা নয়। এটা আমার প্রকাশকের ক্ষতি, একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের থমকে যাওয়া পরিকল্পনা।

একটি বই প্রকাশ না হওয়া মানে—

কয়েক মাসের প্রস্তুতি ভেস্তে যাওয়া,

বিনিয়োগ আটকে যাওয়া,

আর বিশ্বাসে নীরব ফাটল ধরা।

লেখক লিখে যান, কিন্তু প্রকাশ নিয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন না।

প্রকাশক চেষ্টা করেন, কিন্তু হাসিটা কৃত্রিম হয়ে ওঠে।

পাঠক আসেন, কিন্তু হাতে বই কম।

২০২৬ সালের বইমেলায় লেখক, প্রকাশক ও পাঠক—তিন পক্ষই যেন ক্লান্ত।

একুশের বইমেলা একদিন ছিল প্রাণের মেলা।

আজ অনেকের কাছে তা দায়িত্ব পালন।

তবু এত হতাশার ভেতরেও আমরা একুশকে ছাড়তে পারি না। প্রশ্ন করি, সমালোচনা করি, কষ্ট পাই—তবু ভালোবাসি। কারণ একুশ আমাদের স্মৃতি। আর স্মৃতি কখনো বাতিল করা যায় না।

হয়তো ২০২৬ সালের বইমেলা ইতিহাসে লেখা থাকবে

একটি কঠিন একুশ হিসেবে—

যেখানে বই কম ছিল, আনন্দ কম ছিল,

কিন্তু প্রশ্ন ছিল অনেক।

আর সেই প্রশ্নগুলোর ভেতর দিয়েই হয়তো

আরেকটি সত্যিকারের প্রাণের একুশের পথে

হাঁটছে বাংলা বইমেলা।

জনপ্রিয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *