জাসদের রাজনীতি, সংগ্রাম, ত্যাগ, ভাঙন (পর্ব-২)

‘গণবাহিনী’ গঠন

মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া বেসামরিক সদস্যদেরকে (ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী প্রভৃতি) গণবাহিনী বলা হতো। সেই গণবাহিনী থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাসদ সেনাবাহিনীর বিকল্প সশস্ত্র সংগঠন ‘গণবাহিনী’ গড়ে তোলে। এটি ছিল দলটির সশস্ত্র সংগঠন। স্বাধীন দেশে একটি দল এভাবে সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে রূপ নেওয়ায় ওই সময়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগের পর কর্নেল আবু তাহেরের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। অক্টোবরে আ স ম আব্দুর রবের সঙ্গে তাহেরের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় তাহের নতুন দলের সিনিয়র সহ–সভাপতি হবেন। তবে কৌশলগত কারণে তাঁর নাম ঘোষণা করা হবে না। শুধু নেতৃবৃন্দই বিষয়টি সম্পর্কে জানবেন।

জাসদে সাংবিধানিকভাবে তাহেরের মূল দায়িত্ব ছিল সামরিক বাহিনীতে সংগঠন গড়ে তোলা। সে সময় জাসদ তার সশস্ত্র ফ্রন্ট হিসেবে গণবাহিনী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। গণবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হন কর্নেল (অব.) তাহের। (হোসেন, আনোয়ার, ২০১২)

জাসদ ‘নিষিদ্ধ’

এক সময়ে বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য নেতাদের দল জাসদ তাঁর শাসনামলেই নিষিদ্ধ হয়। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ২৩৭ টি আসনে জাসদ প্রার্থী দিলে একটি বাদে সব আসনে পরাজিত হয়। একমাত্র নির্বাচিত হন টাঙ্গাইলের আব্দুস সাত্তার। পরে উপ–নির্বাচনে রাজশাহী থেকে জাসদ নেতা মইন উদ্দিন মানিক নির্বাচিত হন। এদিকে, চাঁদপুর থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচিত এমপি আবদুল্লাহ সরকার জাসদে যোগ দেন। এতে পার্লামেন্টে জাসদের এমপি হন তিনজন।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাকশাল গঠন করলে এতে যোগ দেন টাঙ্গাইলের আব্দুস সাত্তার। জাসদের অন্য দুই এমপি মইন উদ্দিন মানিক ও আবদুল্লাহ সরকার বাকশালে যোগ না দেওয়ায় বঙ্গবন্ধু তাঁদের উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। ফলে তাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়। একই সঙ্গে রাজনীতিতে জাসদকে ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়।

‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ গঠন

১৯৭৩ সাল থেকে জাসদ সভাপতি মেজর (অব.) জলিলের নেতৃত্বে ঢাকা সেনানিবাসের প্রায় সব ইউনিটে ও বগুড়া সেনানিবাসে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গড়ে ওঠে। ঢাকার চারপাশে প্রায় ৪০টি স্থানে ঘাঁটি গঠন করে একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেটি হলো– সেনাবাহিনীর মধ্যে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে সিপাহিদের অভ্যুত্থান এবং ঢাকাসহ শহর এলাকায় ছাত্র, যুবক ও শ্রমিকদের গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করা। এই সুযোগ আসে ১৯৭৫ এর নভেম্বরে।

অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংগঠিত সেনা অভ্যুত্থান ও এর প্রতিক্রিয়ায় সেনাবাহিনীতে যে অসন্তোষ হয়েছিল, সেই সুযোগ কাজে লাগানো।

তাহেরকে অভ্যুত্থানের নীলনকশা প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়ে ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় একটি বৈঠক হয়। সেখানে কর্নেল তাহের পুরো পরিকল্পনাটি তুলে ধরেন। সভা শেষে বিদায়ের সময় তাহের সবাইকে বলেন, রাত ঠিক ১টায় অভ্যুত্থান হবে।

অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে এক ঘোষণায় বলা হয়েছিল– ‘বাংলাদেশের বীর বিপ্লবী জনগণ, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও বিপ্লবী গণবাহিনীর নেতৃত্বে বাংলাদেশে সিপাহি জনতার বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হয়েছে।’

৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের সেনা প্রধান হওয়া ও জিয়াউর রহমানকে বন্দি করার বিষয়টি সাধারণ সৈনিক ও বেশিরভাগ অফিসার মেনে নিতে পারেননি। ৪, ৫ ও ৬ নভেম্বর অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি চলে। এর মধ্যেই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মাধ্যমে কর্নেল তাহেরের কাছে জিয়াউর রহমান বার্তা পাঠান, ‘তাহের আমাকে মুক্ত করো, আমাকে বাঁচাও।

জাসদের গোপন বিপ্লবী প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি (সিওসি) ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ৭ নভেম্বর ভোরে জিয়া ও তাহেরের নেতৃত্বে ক্যান্টনমেন্ট থেকে অফিসার ও সৈনিকরা ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও সামরিক যান নিয়ে শহীদ মিনারে যাবেন। একই সময়ে ছাত্র–যুবক ও শ্রমিকেরা শহীদ মিনারে যাবেন। সেখানেই বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল গঠন ও সব দল, সৈনিক, শ্রমিক ও ছাত্র যুবকদের নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করা হবে।

কিন্তু ক্যান্টনমেন্টে ওই সময় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ছাড়াও স্বার্থান্বেষী আরো কিছু গোষ্ঠী দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠে। তারাই জিয়াকে তাদের পক্ষে নিতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে সিওসি নেতাদের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের অভাবে অভ্যুত্থান বেহাত হয়ে যায়। (পেয়ারা, শামসুদ্দিন, ২০২৩)

জাসদ ‘গৃহপালিত বিরোধীদল’

স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চে চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বেশিরভাগ দল ভোট বর্জন করে। মাত্র ছয়টি দল নির্বাচনে অংশ নেয়। জাতীয় পার্টি ২৫২টি আসনে বিজয়ী হয়। অন্যদিকে, আ স ম রবের নেতৃত্বে জাসদের একাংশ, জাসদ (শাজাহান সিরাজ) ও ছোট ছোট দল ১৯টি আসন পেয়েছিল। সংসদ নেতা হন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ আর সম্মিলিত বিরোধীদলের নেতা হন আ স ম আব্দুর রব। চতুর্থ সংসদের এই বিরোধী দল তখন ‘গৃহপালিত’ খেতাব পেয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

  • Hello world!

    Welcome to WordPress. This is your first post. Edit or delete it, then start writing!

    Read More

  • একুশের মেলা, না-আসা বই, আর লেখকের নীরব দীর্ঘশ্বাস একুশ কোনো সাধারণ তারিখ নয়। একুশ মানে ভাষা, আত্মপরিচয়, মাথা নত না…

    Read More

  • কর্ণেল তাহের ও তার পৃথিবী সমান স্বপ্ন!

    কর্নেল তাহের বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ব্ল্যাক বক্স’! শাহাদুজ্জামান তাঁর ‘ক্রাচের কর্নেল’ উপন্যাসে তাঁকে বলেছেন এক আশ্চর্য নামে। বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ব্ল্যাক বক্স’।…

    Read More