১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন করা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং এর প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। এ সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বেশ কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্তও নিয়েছিল। এক বছরের মধ্যে একটি সংবিধান প্রণয়ন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।

১৯৭৩: প্রথম সংসদ নির্বাচন
১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর নতুন সংবিধান কার্যকর হয়। এর অধীনে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাপ (ভাসানী), সিপিবি, জাসদসহ মোট ১৪টি দল অংশ নেয়। নির্বাচনে মোট প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৯ জন।
ওই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে নির্বাচনকে ‘মুজিববাদ’ এবং সংবিধানের ওপর ‘গণভোট’ বলে দাবি করা হয়েছিল। অন্যদিকে বিরোধী দল ন্যাপ (ভাসানী) ও জাসদ বলেছিল, তারা নির্বাচিত হলে একটি গণতান্ত্রিক ও ‘খাঁটি’ সমাজতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করবে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও রাজনীতিতে তখন প্রগতিশীল ও বামপন্থী প্রবণতা ছিল লক্ষণীয়। ’৭৩–এর নির্বাচন উপলক্ষে দলগুলোর ঘোষিত ইশতেহারেও এর স্পষ্ট প্রতিফলন ছিল। নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব দলই সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
সে সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে জনগণ ছিল কিছুটা অসন্তুষ্ট। এ ছাড়া নির্বাচনের কয়েক মাস আগে আওয়ামী লীগ ভেঙে নতুন দল জাসদ গঠিত হয়েছিল। এরপরও নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল নিশ্চিত।
এ বিষয়ে মওদুদ আহমদ তাঁর বাংলাদেশ: শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল বইয়ে লিখেছেন, ‘এ সময়ে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি দিনে দিনে ক্ষুণ্ন হয়ে চললেও ব্যক্তি হিসেবে শেখ মুজিবের অবদান ছিল তখনো প্রশ্নাতীত এবং একমাত্র তাঁর জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করেই আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের তুলনায় অনেক বেশি প্রাধান্য বিস্তার করে চলে। শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত ইমেজ নির্বাচনের ওপর তার নিদারুণ প্রভাব বিস্তার করে চলে এবং এর ফলে আওয়ামী লীগ যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করবে, এ নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ ছিল না।…’
প্রথম সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের ১১টিতে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চারটি আসনে প্রার্থী হন এবং দুটি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত অন্য নয়জন ছিলেন সোহরাব হোসেন, তোফায়েল আহমেদ, মোতাহার উদ্দিন, কে এম ওবায়দুর রহমান, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া, মনোরঞ্জন ধর, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও জিল্লুর রহমান।
সরকার–সমর্থক সংবাদপত্রগুলোতেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, বিরোধী দলগুলো ১৫-২০টি আসন পেতে পারে। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, ২৮৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৮২ আসনে জয়ী হয়েছে। ২টি আসনে বিরোধীরা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন বাকি ৫টি আসনে। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় লীগের প্রবীণ নেতা আতাউর রহমান খানের জয়লাভের বিষয়টি ছিল উল্লেখযোগ্য।
এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৫.৬২ শতাংশ। মোট বৈধ ভোটের ৭৩.২০ ভাগই পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮.৩৩ ভাগ ভোট পেয়েছিল ন্যাপ (মোজাফফর)। এরপর জাসদ ৬.৫২ এবং ন্যাপ (ভাসানী) পেয়েছিল ৫.৩২ ভাগ ভোট।
নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয়ের সম্ভাবনা সত্ত্বেও বিরোধীদের প্রতি আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল বেশ কঠোর। নির্বাচনে বেশ কিছু আসনে ভোট গণনায় বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা এগিয়ে থাকলেও তাঁদের শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে দেওয়া হয়নি বলে বিরোধীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদকে জয়ী ঘোষণার বিষয়টি ছিল বহুল আলোচিত।
এ বিষয়ে তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা বইয়ে শারমিন আহমেদ লিখেছেন, ‘নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলেও দলের কিছু নেতা নির্বাচনে কারচুপি করে জিতেছে এ খবর কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং বড়দের আলোচনা থেকেও সে খবর শুনতে পাই। সিলেটের কয়েকটি আসনে কারচুপি এবং কুমিল্লায় খন্দকার মোশতাক চুরি করে জিতেছে এই খবরগুলো রাজনৈতিক মহলে তখন অজানা ছিল না।’
১৯৭৩ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুটি আসন হারায়। তবে সেই সময় জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১৫টি আসনের সবগুলোই লাভ করে আওয়ামী লীগ। এর ফলে সংসদে মোট ৩১৫টি আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আসনসংখ্যা ছিল ৩০৬।
এ নির্বাচন নিয়ে সরকারি দলের প্রতি বিরোধী দলগুলোর অনাস্থা ও অবিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল। স্বল্পসংখ্যক আসন পাওয়ায় সংসদে বিরোধীরা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। অন্যদিকে সংসদে ‘ব্রুট মেজরিটি’ থাকায় সরকারের পক্ষে ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

